কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে মোছা. হালিমা (৬৫) হত্যা মামলার প্রায় সাড়ে তিন বছর পর রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশীসহ প্রতিপক্ষকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বসতভিটার জমি দখলের আশায় মেয়ের পরিকল্পনায় হালিমাকে হত্যা করা হয় বলে জানান তারা। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে ও মামলার বাদী চাম্পা (৪৮)কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) পিবিআই কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
এর আগে গত ১৮ আগস্ট চাম্পা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাতে করিমগঞ্জ উপজেলার সিন্দ্রীপ গ্রামের নিজ বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়েন হালিমা। পরদিন সকালে তার মেয়ে চাম্পা দেখতে পান, ঘরের দরজা বাইরে থেকে শিকল দেওয়া। দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে মাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তিনি। পরে বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরের একটি পতিত জমিতে হালিমার মরদেহ পড়ে থাকার খবর পান স্থানীয়রা।
স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান, হালিমার মাথার অংশ মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে। তার নাক-মুখে রক্তাক্ত জখম এবং গলায় সাদা রশি পেঁচানো ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে চাম্পা বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করে করিমগঞ্জ থানায় মামলা করেন। থানা পুলিশ দুই দিন তদন্ত করার পর মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় সংস্থাটি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তদন্তভার গ্রহণ করে। তদন্তের একপর্যায়ে মামলার বাদী চাম্পার আচরণ ও বক্তব্যে সন্দেহ হয় তদন্তকারীদের। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআইয়ের দাবি, প্রায় ৩০ বছর আগে হালিমা প্রতিবেশী বিল্লালের কাছ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ বসতভিটার জমি কিনেছিলেন বলে দাবি করতেন। তবে ওই জমির কোনো দলিল ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিল্লাল জমিটি দুলাল নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করলে দুলাল হালিমার বিরুদ্ধে উচ্ছেদের মামলা করেন। এ নিয়ে বিল্লালের সঙ্গে হালিমার বিরোধ চলছিল।
পিবিআই আরও জানায়, ঘটনার প্রায় ১৫ দিন আগে পূর্বশত্রুতার জেরে বিল্লাল হালিমাকে মারধর করেন। পরে তাকে করিমগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়া এবং প্রতিবেশী বিল্লালসহ অন্যদের হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বসতভিটার জমি পাওয়ার উদ্দেশ্যে চাম্পা সহযোগীদের নিয়ে মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাত ১১টার দিকে সহযোগীরা বাড়িতে এলে চাম্পা তার মাকে ডেকে আনেন। পরে সহযোগীরা হালিমাকে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে মরদেহের মাথা মাটিতে পুঁতে রাখে বলে পিবিআইয়ের দাবি। পরদিন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চাম্পা প্রতিবেশী বিল্লালসহ অন্যদের আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে দীর্ঘ তদন্তে মামলার বাদী চাম্পার সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে।
পিবিআই কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত পূর্বশত্রুতা এবং প্রতিপক্ষকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জমি পাওয়ার আশায় মেয়ের হাতে মাকে হত্যার ঘটনা অত্যন্ত জঘন্য ও গর্হিত অপরাধ। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
কেকে/ এমএস