শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: রাষ্ট্রপতির শপথ ঘিরে যেসব সড়ক এড়িয়ে চলার পরামর্শ      নাইজেরিয়ায় নৌকাডুবিতে নিহত ৪৬      বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ আজ      ফখরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি      রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামকে চীনের অভিনন্দন      মির্জা ফখরুল ইসলাম ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত      সংবিধানের ৭০ ধারায় পরিবর্তন আসবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ঢাকার বাইরেও ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি
শরীফ আহমদ ইমন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০০ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বর্ষার চেনা ছকের বাইরে গিয়ে এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ যেভাবে দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এতদিন ঢাকার ভেতরে ডেঙ্গুর আক্রমণ সীমাবদ্ধ থাকার প্রচলিত ধারণা ভেঙে এখন জেলা হাসপাতালগুলোর বেড পূর্ণ হচ্ছে ঢাকার বাইরের ডেঙ্গু রোগীদের ভিড়ে। 

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুলাই থেকেই বাড়ছে। তবে আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই জুলাইয়ের চেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০০-এর বেশি। 

এদিকে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৭৭ জন মারা গেছেন। আর আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ২২ জনে। তবে অন্যান্য বছরের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন আর মূলত রাজধানী ঢাকা-কেন্দ্রিক নয়। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। 

ফলে কোনো কোনো এলাকায় ডেঙ্গু দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং সামনে পরিস্থিতি কোথায় বেশি খারাপ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে সাধারণত এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। ফলে আক্রান্তের সংখ্যা সামনে আরো বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
 
ঢাকার বাইরে বেশি সংক্রমণ যে পাঁচ জেলায় 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজারের বেশি মানুষ। এ সময়ে ঢাকায় মারা গেছেন ৩৪ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে ঢাকাতেই সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। 

ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে খুলনা জেলায়। এ জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি। মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকেও খুলনা শীর্ষে। সেখানে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৪ জন।

এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। সেখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৯১ জন। মারা গেছেন তিনজন।

আক্রান্তের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশালের পিরোজপুর। এ জেলায় এ বছর এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন একজন।

চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ জেলা। সেখানে ৯২৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ছয়জন।

ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ৭২০। তবে সেখানে ডেঙ্গুতে কারো মৃত্যু হয়নি। এই বিভাগের শুধু মানিকগঞ্জে একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
 
খুলনায় বাড়ি বাড়ি ডেঙ্গু, উৎকণ্ঠায় নগরবাসী

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন খুলনা মহানগরীর বাসিন্দারা। চলতি মৌসুমে বাড়িতে বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টিকে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী রেড, অরেঞ্জ ও ইয়েলো জোনে ভাগ করে মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করেছে। পাশাপাশি চলছে ক্র্যাাশ প্রোগ্রাম ও মোবাইল কোর্ট। 

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত কেসিসি এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৮৮ জন। এ সময়ে ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ২৬৭ এবং মারা গেছে দুজন। 

কেসিসির ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ নাম্বার ওয়ার্ডে ১১১ জন। এরপর ২৯ নাম্বারে ১০০, ২৮ নাম্বারে ৮০, ২২ নাম্বারে ৭৭, ১৮ নাম্বারে ৬৫, ১৭ নাম্বারে ৫৪, ২৭ নাম্বারে ৫১, ২৩ নাম্বারে ৫০ এবং ২৪ নাম্বারে ৪৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকির রেড জোনে রয়েছে ২২, ২৮, ২৯ ও ৩০ নাম্বার ওয়ার্ড। মাঝারি ঝুঁকির অরেঞ্জ জোনে ১৭, ১৮, ২৩ ও ২৪ নাম্বার এবং কম ঝুঁকির ইয়েলো জোনে ১৫, ২০, ২৫ ও ৩১ নাম্বার ওয়ার্ড রাখা হয়েছে।
 
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেছেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে ১০-১২টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ৫১টি ফগার, ৮৫টি হ্যান্ড স্প্রে ও চারটি হুইল ব্যারো মেশিন দিয়ে মশকনিধন কার্যক্রম চলছে। জনসচেতনতা বাড়াতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে।”

চট্টগ্রামে মশক নিধনে নেই সুফল নেই, ডেঙ্গুর দাপট 

কোটি কোটি টাকার মশক নিধন কার্যক্রম সত্ত্বেও চট্টগ্রাম নগরীতে মশার উপদ্রব কোনোভাবেই কমছে না। বর্ষার মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় নগরজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপও দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব চরম উদ্বেগজনক বলে উঠে এসেছে। 

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৪৯৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫৩৬ জন, আর আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৬৬৩ জন। বর্তমানে জেলার সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী।

এই সময়ে মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। 

চট্টগ্রামের সদ্য ওএসডি হওয়া সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “জুলাই ও আগস্টের প্রথম দিকের আক্রান্তের সংখ্যা বছরের প্রথম ছয় মাসের মোট আক্রান্তের প্রায় দ্বিগুণ। বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। তবে আক্রান্তদের ৯৯ শতাংশের বেশি সুস্থ হয়ে উঠছেন। মারা যাওয়া তিনজনই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেরি করেছিলেন।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক জরিপেও চট্টগ্রাম নগরীর মশার পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ৮ থেকে ১৮ জুন নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে পরিচালিত জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। পরীক্ষা করা ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতেও লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
 
জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।

মশা মারার ছয় ওষুধের পাঁচটিতেই করে না কাজ 

বহুল ব্যবহৃত এডিস মশা মারার ওষুধের (মশানাশক) বেশির ভাগেই আর কাজ হচ্ছে না। এসব ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন শ্রেণির ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করে পাঁচটির বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা। কোনো কোনো মশানাশকের মাত্রা ১০ গুণ বাড়ানোর পরও ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এডিস মশা বেঁচে ছিল। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের ইনস্টিটিউট অব হেলথ সিকিউরিটির গবেষকদের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকেরা মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত দুটি জিনগত পরিবর্তনও শনাক্ত করেছেন।

পরীক্ষায় কার্যকর পাওয়া গেছে অর্গানোফসফেট শ্রেণির ম্যালাথিয়ন। এটি প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম-দুই শহরেই মাঠ থেকে সংগ্রহ করা ৯৮ শতাংশ মশা মারা গেছে।

গবেষণা শুরু হয় ২০২৩ সালে। এটি এখনো চলছে। চলতি মাসের শুরুতে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে এশিয়া প্যাসিফিক মসকিউটো অ্যান্ড ভেক্টর কন্ট্রোল কনফারেন্সে এটি তুলে ধরা হয়।


কেকে/সাশ 







আরও সংবাদ   বিষয়:  ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি   ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close