রাজশাহীর বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আলু পচে নষ্ট হওয়ায় চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ এবং হিমাগার ব্যবস্থাপনার ত্রুটিকেই আলু পচনের প্রধান কারণ বলে অভিযোগ করছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে হিমাগার মালিকেরা দায়ী করছেন ঘন ঘন লোডশেডিংকে। ফলে নষ্ট আলুর দায় ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা দিয়েছে।
চাষিদের অভিযোগ, হিমাগারগুলোর নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও মৌসুমের শুরুতে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত আলুর কারণে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বাতাস চলাচল না করায় পচন ধরছে।
তবে হিমাগার মালিকেরা বলছেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আলু পচন রোধে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা জ্বালানি খরচ হচ্ছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৩৯টি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সচল। এসব হিমাগারে মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। তবে এবার উৎপাদন বেশি হওয়ায় অনেক হিমাগারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মৌসুমের শুরুতে রাজনৈতিক নেতাদের চাপেও কিছু হিমাগার অতিরিক্ত আলু নিতে বাধ্য হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তানোর উপজেলার তালন্দ এলাকায় অবস্থিত তামান্না স্পেশাল কোল্ড স্টোরেজ থেকে প্রতিদিন গাড়িভর্তি করে পচা আলু বের করা হচ্ছে। সেখানে আলু সংরক্ষণ করা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু লোড নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে আলু ঘেমে পচে যাচ্ছে। পচে যাওয়া আলু ফেলে দিতে হচ্ছে।’
রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী বলেন, ‘লোডশেডিংয়ে তেমন সমস্যা হচ্ছে না। হিমাগার মালিকদের অব্যবস্থাপনার কারণেই আলু পচছে। মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত আলু নেওয়ায় এখন সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।’
সংগঠনটির সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি বলেন, ‘ওভারলোডিংয়ের কারণে আলু পচে যাচ্ছে। একটি হিমাগারে বছরে ২৫ থেকে ৩০ বার আলুর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। এ সময় আলু বের করে বাতাস দেওয়াও প্রয়োজন। এতে অতিরিক্ত খরচ হয়। কিন্তু ধারণক্ষমতার বেশি আলু থাকায় অনেক হিমাগার এবার এ প্রক্রিয়া ঠিকভাবে করতে পারছে না।’
ডনি আরও বলেন, ‘রাজশাহীর আলাই বিদিরপুরে রহমান ব্রাদার্স-১ কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন। অথচ সেখানে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।’
এভাবে জেলার প্রায় সব হিমাগারেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে চাপের কারণে কিছু হিমাগার অতিরিক্ত আলু নিতে বাধ্য হয়েছিল। তবে হিমাগার ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না এবং এ কারণে আলু নষ্ট হওয়ার কথাও নয়।’
লোডশেডিংয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত হিমাগার ঠাণ্ডা থাকে। এরপরও বিদ্যুৎ না এলে জেনারেটর চালাতে হয়। প্রতি ঘণ্টায় জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি হিমাগারকে মাসে ২৫ থেকে ২৮ লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়।’
তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান তিনি।
রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, ‘গত বুধবার থেকে লোডশেডিং কমে গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি ভালো। হিমাগারগুলোতে সমস্যা হচ্ছে এমন অভিযোগ জানিয়ে কেউ ফোন করেননি।’
কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও হিমাগারগুলোতে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয় বলেও জানান তিনি।
এদিকে আলু পচে ক্ষতিগ্রস্ত চাষি ও ব্যবসায়ীরা বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নষ্ট আলুর ক্ষতিপূরণ নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
কেকে/এআই