জীবনের যে বয়সে সমবয়সীরা ছুটে বেড়ায়, খেলাধুলা করে আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, সেই বয়সেই লাঠিতে ভর করে পথ চলতে হয় ১৬ বছরের মো. আকাশ মিয়াকে। দুই পায়ের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না সে। দারিদ্র্যের কারণে হয়নি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, থেমে গেছে পড়াশোনাও। এখন চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সহায়তার আশায় দিন কাটছে আকাশ ও তার পরিবারের।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের ঝিকড় জোড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আওয়ালের ছেলে আকাশ। জন্মের পর থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে সে। দুই পা অচল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। লাঠিই এখন তার একমাত্র ভরসা।
আকাশ ঝিকড় জোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। এরপর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে আর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল তার। সেই স্বপ্ন এখনো বুকের ভেতর লালন করে আকাশ।
আকাশ বলেন, ‘আমি খেলতে পারি না। আমার পায়ে সমস্যা। মানুষের মতো চলাচল করতে পারি না। ইচ্ছে আছে, কাজ করব, কাজ করে বাপরে খাওয়ামু। স্কুলে যামু, পড়ালেখা করমু—এই ইচ্ছাডাও পূরণ অই নাই।’
পরিবার জানায়, অভাবের কারণে আকাশের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। সীমিত আয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাদের। ফলে ছেলের চিকিৎসা, চলাফেরার উপযোগী ব্যবস্থা কিংবা পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার মতো সামর্থ্য হয়ে ওঠেনি।
আকাশের মা আমেনা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলেটা যদি সুস্থ থাকত, তাহলে অন্যদের মতো খেলাধুলা করত, কাজ করত, উপার্জন করত। আমারও ইচ্ছা ছিল ছেলেকে পড়াশোনা করাব, চিকিৎসা করাব। কিন্তু টাকার অভাবে কিছুই করতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের পড়াশোনা করানো আর সংসার চালাতেই অনেক কষ্ট হয়। ছোট মেয়ের পড়াশোনার খরচও ঠিকমতো দিতে পারি না। ছেলের চিকিৎসার জন্যও টাকার প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের সেই সামর্থ্য নেই।’
ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আক্ষেপ করে আমেনা আক্তার বলেন, ‘আকাশ প্রায়ই বলে, সে কাজ করতে পারলে উপার্জন করে আমাদের সংসারে সাহায্য করত। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের জন্য কিছু করতে চায়। কিন্তু হাঁটতে না পারায় সে কিছুই করতে পারছে না। চিকিৎসা ও চলাফেরার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ছেলের জীবন কিছুটা সহজ হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহীন মিয়া বলেন, ‘আকাশকে আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। তার দুই পা অচল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারে না। বয়স বাড়লেও তার জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ, আকাশের চিকিৎসা, চলাফেরা ও জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হোক।’
প্রতিবেশী মোহাম্মদ মিল্লাত বলেন, ‘আকাশ ছোটবেলা থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে আসছে। অন্য শিশুদের মতো খেলাধুলা কিংবা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার সুযোগ তার হয়নি। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে তাকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও চলাফেরার উপকরণ দেওয়া হলে তার জীবন অনেকটা সহজ হবে। একই সঙ্গে পড়াশোনায় ফেরার সুযোগও তৈরি হতে পারে।’
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুল হাসান মারুফ বলেন, ‘আপনার মাধ্যমে আমরা আকাশের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, চিকিৎসার অভাব ও পড়াশোনা বন্ধ থাকার বিষয়টি জানতে পেরেছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তার চেষ্টা করা হবে। সে আবার পড়াশোনা করতে চাইলে তার শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় বা বাড়ির কাছাকাছি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
আকাশের চোখে এখনো স্বপ্ন—পড়াশোনা করবে, কাজ করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। আর সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষাও। প্রয়োজন শুধু একটু সহায়তা, চিকিৎসা ও সুযোগ—যাতে লাঠিতে ভর করা এই কিশোর নিজের ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
কেকে/ এমএস