হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। চারদিকে থইথই পানি। পানির বুক চিরে ছুটে চলছে একের পর এক নৌকা। একসঙ্গে বৈঠা চালাচ্ছেন মাঝিরা। হাওরের পাড়ে দাঁড়িয়ে দর্শকদের করতালি, হর্ষধ্বনি ও উচ্ছ্বাসে মুখর চারপাশ। নৌকা বাইচকে ঘিরে নিকলী হাওরে ফিরে আসে গ্রাম বাংলার চিরচেনা উৎসবের আবহ।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার আসানপুর-কাঠালকান্দি এলাকাবাসীর উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে নিকলী হাওরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। আয়োজনকে ঘিরে সকাল থেকেই ছিল উৎসবের আমেজ। দুপুরের পর হাওরের চারপাশে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়।
নিকলীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট-বড় নৌকা নিয়ে মানুষ ছুটে আসেন প্রতিযোগিতা দেখতে। কেউ নৌকায় বসে হাওরে ভেসে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন, আবার কেউ হাওরের পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকার ছুটে চলার দৃশ্য উপভোগ করেন। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী ও বয়স্কদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় আনন্দমুখর মিলনমেলায়।
প্রতিযোগিতা শুরুর সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঝিরা একযোগে বৈঠা চালাতে শুরু করেন। মুহূর্তেই নৌকাগুলো ছুটে চলে পানির ওপর দিয়ে। একে অপরকে পেছনে ফেলে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে শুরু হয় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বৈঠার ছন্দ যত বাড়ে, দর্শকদের উচ্ছ্বাসও ততই বাড়তে থাকে।
এবারের প্রতিযোগিতা দুটি ক্যাটাগরিতে অনুষ্ঠিত হয়—২০ মাঝির নৌকা ও আনলিমিটেড মাঝির নৌকা। দুই ক্যাটাগরিতেই বিভিন্ন নৌকা অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত দুই ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয় মাতাব মাঝির নৌকা ও সেলিম মাঝির নৌকা।
প্রতিযোগী মাঝি আমিরুল ইসলাম বলেন, “নৌকা বাইচ আমাদের কাছে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। বৈঠা হাতে নৌকা নিয়ে পানিতে নামার পর জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি আলাদা আনন্দ কাজ করে।”
আরেক প্রতিযোগী হিমেল মিয়া বলেন, “বাইচের সময় পরিবেশটা একেবারেই আলাদা হয়ে যায়। একসঙ্গে অনেক মাঝি বৈঠা চালালে নৌকা দ্রুত ছুটে চলে। দর্শকদের চিৎকার ও করতালিতে আমাদের উৎসাহ আরও বেড়ে যায়।”
বিজয়ী দলের সদস্য রুমান বলেন, “জয়ের জন্য আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। সবাই সমন্বয় করে বৈঠা চালিয়েছি। বিজয়ী হতে পেরে খুব ভালো লাগছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, এত মানুষ নৌকা বাইচ দেখতে এসেছে।”
নৌকা বাইচ দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা করিম বলেন, “আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের ভিড়ে গ্রাম বাংলার অনেক লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। নৌকা বাইচের মতো আয়োজন সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে মানুষের সামনে তুলে ধরে। নতুন প্রজন্মও আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছে।”
দর্শনার্থী রাকিব হোসেন বলেন, “অনেক দিন পর নৌকা বাইচ দেখে খুব ভালো লাগছে। হাওরের পানিতে নৌকার ছুটে চলা, মাঝিদের বৈঠার ছন্দ আর মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে দারুণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।”
স্থানীয়দের কাছে নৌকা বাইচ শুধু খেলা বা বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বর্ষায় হাওর পানিতে ভরে উঠলে নৌকা হয়ে ওঠে মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেই নৌকাকে ঘিরেই একসময় গ্রাম বাংলার বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠত নৌকা বাইচ।
আয়োজক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি গ্রাম বাংলার হারিয়ে যেতে বসা নৌকা বাইচের ঐতিহ্য ধরে রাখাই ছিল আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। মানুষের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজন করা হবে।”
প্রতিযোগিতা শেষে চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ দলের মধ্যে পুরস্কার তুলে দেন আয়োজক কমিটির সদস্যরা। বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়ার সময়ও ছিল আনন্দের আবহ। দর্শকরাও করতালি দিয়ে বিজয়ীদের অভিনন্দন জানান।
কেকে/সাশ