প্রবাস থেকে দেশে ফিরে বেকার না থেকে কৃষিকাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তরুণ কৃষক নজরুল ইসলাম (২৬)। কঠোর পরিশ্রম, ঋণ এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে নেওয়া জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে গড়ে তুলেছিলেন আগাম সবজির সম্ভাবনাময় ক্ষেত।
বৃহস্পতিবার (২৬ আগস্ট) দিবাগত রাতে কে বা কারা আগাছানাশক জাতীয় রাসায়নিক স্প্রে করে তার প্রায় পুরো ফসল নষ্ট করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
ঘটনাটি ঘটেছে লোহাগাড়া উপজেলার পশ্চিম কলাউজান ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাছন মিয়াজি পাড়ার বাংলাবাজার-কানুরাম বাজার সড়কের দক্ষিণ পাশের বিলে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে প্রতিদিনের মতো ক্ষেতে গিয়ে নজরুল ইসলাম দেখতে পান, সবুজে ভরা ক্ষেতের অধিকাংশ গাছ ঝলসে গেছে। টমেটো, শসা, মূলা ও বেগুনসহ বিভিন্ন সবজির গাছ নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নজরুল ইসলাম উত্তর কলাউজান ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত ইসলাম সওদাগরের ছেলে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৭৮ শতক জমিতে তিনি প্রায় ৪ হাজার টমেটোর চারা, ৩৩০টি শসার গাছ, ৬ শতাধিক মূলার গাছ এবং অনেক বেগুনের গাছসহ বিভিন্ন আগাম সবজি চাষ করেছিলেন। বর্ষার অতিবৃষ্টি থেকে ফসল রক্ষায় ক্ষেতজুড়ে পলিথিনের ছাউনিও স্থাপন করেছিলেন তিনি।
নজরুল ইসলাম জানান, স্থানীয় জমির মালিক আনোয়ারা বেগমের কাছ থেকে ১০ বছর মেয়াদি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে জমিটি ইজারা নিয়ে কৃষিকাজ করে আসছেন। উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে আধুনিক কৃষিপদ্ধতি অনুসরণ করে গড়ে তোলা ক্ষেতটি দিন দিন সবুজে ভরে উঠছিল। গাছে ফুল আসায় আগাম ফসল নিয়ে নতুন আশাও তৈরি হয়েছিল তার। কিন্তু রাতের আঁধারে রাসায়নিক স্প্রে করে ক্ষেত নষ্ট করে দেওয়ায় সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে পড়েছে।
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। তিলে তিলে কঠোর পরিশ্রম করে এবং ঋণ নিয়ে আমি এ ক্ষেত গড়ে তুলেছি।’
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি অফিসের একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় কৃষক নজরুল ইসলামের প্রায় ১৬ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
তবে ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ এবং গাছ নষ্ট হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম বলেন, ‘নজরুল ইসলাম একজন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা এবং উপজেলা কৃষি অফিসের সুবিধাভোগী কৃষক। তার ক্ষেতের এমন ক্ষতি অত্যন্ত দুঃখজনক। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির জন্য যা যা করা প্রয়োজন, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’
একই সঙ্গে তিনি ঘটনাটিকে গর্হিত ও অমানবিক উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
ক্ষেতের ফসল নষ্ট করার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে থানায় মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষক নজরুল ইসলাম। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও ঋণের অর্থ বিনিয়োগ করে গড়ে তোলা ক্ষেত এভাবে নষ্ট হওয়ায় তিনি মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানান।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য আব্দুর রহিম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় বর্তমানে চাপা ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
কেকে/এআই