প্রকৃতিতে এখন শরতের রাজত্ব। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর বাতাসে দোল খাওয়া শুভ্র কাশফুল চারপাশকে অনন্য রূপে সাজিয়ে তুলেছে। শরতের এ অপরূপ রূপ-লাবণ্য মনে করিয়ে দেয় কবি জীবনানন্দ দাশের সেই অমর পঙ্ক্তি— ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।’ শরতে চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গল এখন সেজেছে কাশফুলের শুভ্রতায়, যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী।
শহরের ভানুগাছ রোডে সবুজ চা-বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি ছড়া। সেই ভুরভুরিয়া ছড়ার দুই পাশেই প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে কাশফুলের বিশাল বাগান। শহর থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) সংলগ্ন ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড় ঘেঁষে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফুটেছে সাদা কাশফুল। বাতাসে দোল খাওয়া সেই শুভ্র কাশফুল যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, শরতের কাশফুলের শুভ্র চাদরে ছেয়ে গেছে ভানুগাছ সড়কের বেলতলী সংলগ্ন বিটিআরআই এলাকা। বিশাল কাশবাগানে বাতাসে দুলছে অসংখ্য সাদা কাশফুল। নয়নাভিরাম এ দৃশ্য মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের।
শরৎকালে নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনার সঙ্গে কাশফুল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে তৈরি করে অন্য রকম আবেদন। তাই প্রতিদিন মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে বেলতলীর কাশফুলের বালুচর। প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে বেলতলীর এ বালুচর।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকালে দেখা যায়, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে অনেকেই কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও দল বেঁধে কাশবনে ঘুরতে দেখা যায়। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ হাত বুলিয়ে নিচ্ছেন কাশফুলে, আবার কেউবা ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এ স্নিগ্ধতা। আবার অনেকে মুক্ত বাতাসে পুরো বালুচর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সড়কের পাশে ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে কাশফুলের সঙ্গে ছবি তুলতেও দেখা যায় অনেক পথচারীকে।
কাশবনে ঘুরতে এসেছে সায়মা, নাসরিন, সৈকত, রায়হান, নুরজাহান, রাহুল এবং মুস্তাকিম। তারা জানান, চা বাগানের ফাঁকে ছড়ার পাশে দিগন্তজোড়া কাশফুল যেন এক অন্যরকম সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। শুভ্র কাশফুলের দোল খাওয়া দৃশ্য চোখ ও মন দুটোই ভরিয়ে দেয়। তা স্বচক্ষে দেখতেই এখানে আসা।’
ঢাকা থেকে আসা জাকিয়া তাসনিম বলেন, ‘ঋতু পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। এ সময় রাশি রাশি কাশফুল তার অপরূপ সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে, আর তা উপভোগ করতেই ঢাকা থেকে এখানে আসা।’
শ্রীমঙ্গল আইডিয়াল স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. আফসার মিয়া বলেন, ‘ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড় ঘেঁষে বিশাল এলাকাজুড়ে প্রস্ফুটিত সাদা কাশফুল হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের। শুভ্র কাশফুল যেন প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুলেছে অনন্য রূপে। বাতাসে দোল খাওয়া কাশফুলের মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।’
স্থানীয় ট্যুর গাইড শ্যামল দেব বর্মা বলেন, ‘দিগন্তজোড়া কাশফুলের মনোরম দৃশ্য যে কাউকে আন্দোলিত করে। শরৎ ঋতুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য কাশফুল পর্যটন আকর্ষণেও বড় ভূমিকা রাখছে।’
শহরের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেল বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের কাশবন স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও প্রতি বছর প্রায় দুই মাসের জন্য দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। শরতের ঝকঝকে আকাশের নিচে হাওয়ায় দোল খায় শুভ্র কাশফুল—এ দৃশ্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন নানা বয়সী মানুষ।’
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, কাশফুল এক ধরনের বহুবর্ষজীবী ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। এটি সাধারণত প্রায় ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। নদীর তীরে ফুটে থাকা শ্বেতশুভ্র কাশবন দেখতে অত্যন্ত মনোরম।
স্থানীয়রা জানান, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর জুড়ে কাশফুলের এ মেলা থাকে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এখানে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়।
প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কাশফুল না ছিঁড়ে শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা।
তাদের প্রত্যাশা, দর্শনার্থীদের সচেতনতায় শ্রীমঙ্গলের এ প্রাকৃতিক কাশবন টিকে থাকবে আরও দীর্ঘদিন। সবার সচেতনতায় শ্রীমঙ্গলের এ প্রাকৃতিক কাশবন টিকে থাকুক এবং শরতের শুভ্রতায় পর্যটকদের মুগ্ধ করুক—এটাই সকলের প্রত্যাশা।
কেকে/এআই