বিদ্যুৎ সংকটে দেশজুড়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বেশির ভাগ জায়গায়ই দিনে ১২ থেকে ১৪ বার লোডশেডিং চলছে। এর ফলে অনেক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে জেনারেটর চালিয়ে কার্যক্রম চলছে। আবার যেখানে জেনারেটর নেই, সেখানে অনেক কার্যক্রমই বন্ধ থাকছে। কোথাও মুঠোফোনের টর্চ জ্বালিয়ে কিছু কার্যক্রম চলছে। ভর্তি থাকা রোগী ও তাদের স্বজনরা তীব্র গরমে অস্থির হয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিরা গরমে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এ ছাড়া বয়স্ক মানুষ, শিশু, শিক্ষার্থীসহ আইটিভিত্তিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকাসহ মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিত্র প্রায় একই। দিনে ১০ থেকে ১২ বার লোডশেডিংয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি বিভাগ, প্যাথলজি ও অপারেশন থিয়েটারে কার্যক্রম চলছে না বললেই চলে।
সরেজমিন মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা যায়- ঘণ্টার পর ধরে বিদ্যুৎ নেই। গত কয়েকদিন ধরে ভর্তি থাকা রোগী ফয়সাল আহমেদ জানান, বিদ্যুৎ এলে ১০-২০ মিনিট থেকে আবার চলে যায়। দিনের চেয়ে রাতের অবস্থা খুব খারাপ।
ভুক্তভোগীরা জানান, লোডশেডিংয়ের সময় শহরের হাসপাতালে জেনারেটরের আলোয় কিছুটা মুক্তি মেলে। কিন্তু এখানে সে ব্যবস্থাও নেই। বিদ্যুৎ গেলে আসার খবর থাকে না। বহির্বিভাগে লাইনে থাকা রোগীদের স্বজনরাও রোগী হয়ে যান। তারা বলেন, বাসায় বিদ্যুৎ নেই, হাসপাতালেও একই অবস্থা। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের কারণে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও সৈয়দ ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসার জন্য অনেক জরুরি রোগী আসেন। সেজন্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখা জরুরি। কিন্তু সিস্টেম লস থাকায় আসলে কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, তীব্র গ্যাস-সংকট, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ স্বল্পতার পাশাপাশি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। দিন-রাত সমানতালে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে বাসাবাড়ির রান্না ও শিল্প উৎপাদনে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গত বৃহস্পতিবার গ্যাসের সরবরাহ ছিল মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট। মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি গত জুলাইয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। সেটি সচল হলেও নিয়মিত এলএনজি কার্গো সময়মতো না পৌঁছানোয় সংকট রয়েই গেছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্যাস সংকটের কারণে ঢাকার বাইরে পল্লী অঞ্চলের মানুষ তীব্র লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। তবে গত ১২ আগস্ট থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিদিন প্রতিটি এলাকায় এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা নিলেও মাঠপর্যায়ে তার চেয়েও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
জানা গেছে, দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। বাকি ৪২টি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় চলেছে। দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছে। গত ১০ আগস্ট চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়। গতকাল শুক্রবার ২ হাজার ৬৯৫ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। শুধু জ্বালানি সংকটের কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ কমিয়ে গ্যাসের বড় অংশ এখন শিল্পকারখানায় দেওয়া হচ্ছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। দেশের ৮টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা এবং বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট। এ ছাড়া কয়লা সরবরাহের সমস্যার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের দেড় হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দিনে ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও তারা কেবল পিক-আওয়ারে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করছে।
এদিকে পরিস্থিতি সামলাতে উচ্চব্যয়ের জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হলেও ২৪টি কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল সরবরাহের ঘাটতি ছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিমের মতে, বকেয়া পরিশোধসহ পিডিবির সঙ্গে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর চলমান বিরোধ নিষ্পত্তি করা গেলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজের ব্যবহার বা অনভিজ্ঞ কোম্পানির ওপর নির্ভরতার কারণে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলছে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমূল কাঠামোগত সংস্কার, বিশৃঙ্খলা রোধ এবং দুর্নীতি বন্ধ না করলে এ ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
গ্যাসের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা হচ্ছে
পেট্রোবাংলার পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মু. শোয়েব গণমাধ্যমকে বলেন, ধীরে ধীরে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো সরবরাহের ক্ষেত্রেও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, প্রায় ৭৫ টাকায় বিশ্ববাজার থেকে প্রতি ঘনফুট এলএনজি কিনতে হচ্ছে। সেই গ্যাস ১৪ টাকা দরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে দিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসে এক বছরের ভর্তুকি বরাদ্দ গত দুই মাসেই খরচ হয়ে গেছে। সরকার এখন কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার উৎস খুঁজছে।
কেকে/এআই