চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নানাভাবে দেশের রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে। এজন্য নেতাকর্মীরা বিভিন্ন দিবস ও উদযাপনকে বেছে নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করে তারা পরিকল্পনা নিচ্ছেন। বিদেশে পালিয়ে থাকা অনেক নেতা তাদের শেল্টার দিচ্ছেন। প্রশাসন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসররা তাদের সহযোগিতা করছেন। তাদের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তারা মানছেন না। উল্টো বিভিন্নভাবে নাশকতা করতে মাঠের ছক আঁকছেন।
গত ২৬ আগস্ট পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারি দরবারপন্থি বিভিন্ন গ্রুপ ঢাকায় বড় ধরনের জমায়েতের আয়োজন করে। শুধু তাই নয়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে পাঁচ-ছয়টি স্থানে বিশাল জশনে জুলুস বা র্যালির আয়োজন করা হয়। প্রশ্ন উঠছে- পুলিশ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা কীভাবে এসব কার্যক্রম করছেন?
এদিকে, শেখ হাসিনা তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের নিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানিয়েছেন। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা এই ঘোষণা দেন। তিনি ও তার দলের নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আইনি লড়াই ও আদালতের মুখোমুখি হতে চান। তাছাড়া শীর্ষ নেতৃত্বকে ঠিক রেখে বা নতুন সমীকরণে দলকে পুনর্গঠন ও নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীদের যুক্ত করার নানা আলোচনা চলছে। এই ঘোষণার পর থেকে নেতাকর্মীরা আরও বেশি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।
জশনে জুলুস ঘিরে তৎপরতা
ডিসেম্বরে হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণাকে ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটসঙ্গী দলগুলো নানা তৎপরতা চালাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। গতকাল নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, রাজধানী ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় একটি গোয়েন্দা ব্যর্থতার ঘটনা ঘটেছে গত ২৬ আগস্ট।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারি দরবারপন্থি বিভিন্ন গ্রুপ ঢাকায় বড় ধরনের জমায়েতের আয়োজন করে। শুধু তাই নয়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে পাঁচ-ছয়টি স্থানে বিশাল জশনে জুলুস বা র্যালির আয়োজন করা হয়। একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
এ ঘটনাকে গোয়েন্দা ব্যর্থতা চিহ্নিত করার কারণ হিসেবে জুলকারনাইন সায়ের বলেন, মাইজভান্ডারিপন্থি এই গোষ্ঠীটি মূলত নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন চৌদ্দদলীয় জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাইজভান্ডারির রাজনৈতিক দল তরিকত ফেডারেশনের প্রধান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি কয়েক দফা আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন।২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি পলাতক রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ২৬ আগস্ট ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে মাইজভান্ডারি পক্ষ। এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন সাইফুদ্দীন আহমেদ মাইজভান্ডারি। সাইফুদ্দীন আহমেদ ও নজিবুল বশর সম্পর্কে আপন চাচা-ভাতিজা। এই সাইফুদ্দীন আহমেদ আওয়ামী লীগের ২০২৪ সালের নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি’ নামে একটি কিংস পার্টি গঠন করেন। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে দলটিকে তড়িঘড়ি করে নিবন্ধন দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ মিত্র এই মাইজভান্ডারি গোষ্ঠী কীভাবে ঢাকায় এ ধরনের তৎপরতার অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জুলকারনাইন সায়ের। তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এত বড় সমাবেশ এবং ঢাকার একাধিক স্থানে জমায়েতের অনুমতি তাদের কে বা কারা দিল? কীভাবে তারা গোয়েন্দা সংস্থা এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অনুমোদন পেল?
আ.লীগের ঝটিকা মিছিল
শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ও নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ কর্মীদের ঝটিকা মিছিলের খবর আসে। এসব মিছিল থেকে ধরপাকড়ও করার কথা জানায় পুলিশ। গতকাল শুক্রবার ঢাকার উত্তরায় কার্যক্রমে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যানারে অনুষ্ঠিত মিছিল থেকে একজনকে আটক করা হয় বলে উত্তরা পূর্ব থানার ওসি মোরশেদ আলম জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ঝটিকা মিছিল থেকে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে ব্যানারসহ একজনকে আটক করেছে।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ভোরে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছেন। শুক্রবার ভোরে কালীগঞ্জ মেইন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় মিছিল করেন তারা। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানান তারা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর অনন্যা আবাসিক এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেন নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। শুক্রবার সকালে কয়েক মিনিটের ওই মিছিলের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ধানমন্ডিতে মানববন্ধনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান
রংপুরে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত ও বিচারের দাবিতে ঢাকার ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। শুক্রবার বিকেলে মানববন্ধন চলাকালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া নিয়ে উপস্থিত কয়েকজনের মধ্যে প্রতিবাদ ও বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মানববন্ধনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হলে উপস্থিত কয়েকজন এর প্রতিবাদ করেন। এ নিয়ে উপস্থিতদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। এরপরও কয়েকজন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের বিপরীত পাশে ধানমন্ডি ২৬ নম্বর সড়কের লেকের দিকে চলে যান। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, মানববন্ধন শেষে মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।’
ডিসেম্বরে কমিটি, আ.লীগ পুনর্গঠনের প্রস্তুতি
নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগকে নতুনভাবে সাংগঠনিক কাঠামোয় ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলের ভেতরে আলোচিত ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ ধারণা থেকে সরে এসে শেখ হাসিনাকেই শীর্ষ নেতৃত্বে রেখে তুলনামূলক কম বিতর্কিত ও সক্রিয় নেতাদের সামনে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে জেলা, উপজেলা এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের কথা ভাবা হচ্ছে।
দলীয় সূত্র বলছে, নতুন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন- জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, শ ম রেজাউল করিম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও চিকিৎসক হাবিব এ মিল্লাত। পরিস্থিতি বিবেচনায় সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকেও নেতৃত্বের সামনে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার ভাষ্য, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আসাদুজ্জামান খান কামাল, শ ম রেজাউল করিম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চিকিৎসক হাবিব এ মিল্লাত ও মোহাম্মদ এ আরাফাত নিয়মিত অনলাইন ও ফোনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। একইভাবে যুবলীগের নিখিল এবং ছাত্রলীগের সাদ্দাম ও ইনানও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া ওবায়দুল কাদের, শেখ হেলাল ও চিকিৎসক হাছান মাহমুদসহ আওয়ামী লীগের আরও অনেক নেতা অনলাইনে সক্রিয় হয়েছেন বলেও সূত্রের দাবি। তবে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং দলটির সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনীতিতে ফেরা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে রাজনৈতিক মহল।
এ প্রসঙ্গে দলটির সাবেক নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ বলেন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে বা রাজনীতিতে ফিরে আসতে হলে আবার আত্মোপলব্ধি এবং আত্মসমালোচনা করতে হবে। সোহেল তাজ বলেন, আমার কোনো এক্সপেক্টেশন নাই এ দল (আওয়ামী লীগ) থেকে। শুধু আমিই বলে যাচ্ছি- (আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে হলে) অনুশোচনা করতে হবে; আত্মোপলব্ধি করতে হবে; রিয়েলাইজেশন করতে হবে। তো এক আমি যে কিছু করব- আমার কোনো আগ্রহ নেই। কারণ এখানে কোনো রিয়েলাইজেশন নাই। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
কেকে/এআই