অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক হালনাগাদ প্রতিবেদন বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ঋণের চেয়ে ২৭৩ দশমিক শূন্য পাঁচ মিলিয়ন ডলার বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। জুলাইয়ে নতুন ঋণ ছাড় হয়েছে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার, অথচ পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার- অর্থাৎ প্রাপ্তির প্রায় আড়াই গুণ।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সুদ-আসল মিলিয়ে মোট প্রায় ৪৪৯ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সময়ে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি নেমে এসেছে গত চৌদ্দ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ একদিকে নতুন ঋণের প্রবাহ কমে আসছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে।
এই প্রবণতার পেছনে কাঠামোগত কারণ স্পষ্ট। গত দেড় দশকে যেসব বড় প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর সুবিধাজনক শর্তের গ্রেস পিরিয়ড একের পর এক শেষ হয়ে আসছে, ফলে আসল পরিশোধের চাপ এখন পুরোদমে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি অতীতে নেওয়া অনেক ঋণ ছিল তুলনামূলক কম সুবিধাজনক শর্তের, যার কিস্তি ও সুদের হার এখন বাস্তবতার নিরিখে অনেক বেশি চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দাতাসংস্থার শর্ত পূরণে বিলম্ব এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থছাড়ও প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না। এই দুই প্রবণতা একসঙ্গে মিলে বৈদেশিক মুদ্রার নিট প্রবাহকে ক্রমাগত ঋণাত্মক দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যের ওপর।
এ পরিস্থিতিকে কেবল পরিসংখ্যানগত জট ভাবলে ভুল হবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন-সক্ষমতা। ঋণ পরিশোধের চাপ যত বাড়বে, রাজস্ব আয়ের তত বড় অংশ চলে যাবে অতীতের বাধ্যবাধকতা মেটাতে, ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর মতো অগ্রাধিকারমূলক খাতে বরাদ্দ সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। একই সঙ্গে নতুন ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার অর্থ, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে সরকারকে ক্রমশ বেশি নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর, যা মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
ফলে সময় এসেছে এই পরিস্থিতিতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেবার। অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাজনক শর্তে নেওয়া পুরোনো ঋণগুলো চিহ্নিত করে দাতা সংস্থা ও দেশের সঙ্গে সুদহার ও পরিশোধ সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের আলোচনা এখনই শুরু করতে হবে, যাতে স্বল্পমেয়াদি পরিশোধের চাপ কিছুটা লাঘব করা যায়। প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থছাড় বিলম্বিত হওয়ার প্রধান কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও প্রাক্কলনসংক্রান্ত দুর্বলতা। ফলে প্রকল্প অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্রয় প্রক্রিয়ার আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব দূর করে অর্থছাড়ের গতি বাড়াতে হবে, যাতে প্রতিশ্রুত অর্থ সময়মতো দেশে আসে।
নতুন কোনো বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অর্থনৈতিক প্রতিদান, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ পরিশোধ-সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে স্বাধীন মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে অনুৎপাদনশীল বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্পে ঋণনির্ভরতা এড়ানো যায়। বৈদেশিক মুদ্রার নিট প্রবাহ স্থিতিশীল রাখতে রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ এবং প্রবাসী আয়ের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রত্যাবর্তন বাড়ানোর লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো ভয়াবহ সংকটাপন্ন না হলেও, ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং নতুন ঋণপ্রাপ্তির সংকোচন- এ দুইয়ের সম্মিলিত প্রবণতা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। সময়মতো কাঠামোগত সংস্কার না হলে আজকের এই ২৭৩ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি আগামী দিনে আরও বড় সংকটের পূর্বাভাস হয়ে দেখা দিতে পারে। ফলে সরকারের উচিত এখনই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও সমন্বিত ঋণ-কৌশল প্রণয়ন করা, যাতে উন্নয়নের গতি ব্যাহত না করেও আর্থিক স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন রাখা যায়।
কেকে/ এমএস