সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬,
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: দিল্লিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে সেমিনার পুলিশের বাধায় বাতিল      মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কোনো ঝুঁকি দেখছে না ঢাকা : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী      সাবেক সেনাপ্রধান শফিউদ্দিন আহমেদকে তলব দুদকের      সাগর-রুনি হত্যায় একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ‘কানেকশন মিলেছে’ : চিফ প্রসিকিউটর      ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে মাইলফলক হবে লালদিয়া টার্মিনাল : অর্থমন্ত্রী      হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর প্রাণহানি      ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে: রাষ্ট্রপতি      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
তোষামোদ নয়, সমালোচনাই ছিল জিয়ার রাজনৈতিক শক্তি
সাজ্জাদ হোসেন মিলন
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৫ এএম

১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় পাঁচ দশকের পথচলায় বিএনপি দেখেছে আন্দোলন-সংগ্রাম, রাষ্ট্রক্ষমতা, বিরোধী দলের রাজনীতি, সাফল্য, সংকট এবং নানা উত্থান-পতন।

তবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনা প্রয়োজন- জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক শিক্ষা ও সাংগঠনিক দর্শনের কতুকু আমরা ধারণ করতে পেরেছি?

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তোষামোদের প্রতি তার অনাগ্রহ এবং সমালোচনার প্রতি গুরুত্ব। তার কাছে সমালোচনা ছিল দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং ভুল চিহ্নিত করা, বাস্তবতা বোঝা এবং সংশোধনের একটি কার্যকর উপায়।

দলীয় রাজনৈতিক প্রশিক্ষণকে কেন্দ্র করে জিয়াউর রহমানের একটি বক্তব্যের কথা রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে এবং রাজনৈতিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অধ্যক্ষ এ. কে. এ. ফিরোজ নূনের পরিচালনায় এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা জিয়াউর রহমানের প্রশংসা করতে গিয়ে তাকে তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার নেতা মার্শাল টিটোর সঙ্গে তুলনা করেন।

কথিত আছে, এই অতিরিক্ত প্রশংসায় জিয়াউর রহমান সন্তুষ্ট হননি। বরং তিনি অধ্যক্ষ ফিরোজ নূনকে বলেন-
‘এ ধরনের তোষামোদ ও অতিরিক্ত প্রশংসা করলে আমি আর কোনো সেমিনারে আসব না। আমার প্রশংসার জন্য এই সেমিনার নয়। যারা আমার ও আমার দলের সমালোচনা করতে পারবে, তাদের এখানে বক্তা হিসেবে ডাকবেন। তাতে আমারও উপকার হবে, দলেরও উপকার হবে। আমরা আমাদের ভুলত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারব এবং সেগুলো সংশোধন করতে পারব।’

উদ্ধৃতিটির প্রামাণ্য সূত্র যাচাই ও সংযুক্ত করা জরুরি। তবে বক্তব্যটির অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- নেতৃত্বের চারপাশে কেবল প্রশংসাকারী বাড়তে থাকলে বাস্তবতার সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্বও বাড়তে পারে। তোষামোদ সত্যকে আড়াল করে; সমালোচনা সত্যকে সামনে নিয়ে আসে।

একজন নেতা যদি শুধু প্রশংসাই শুনতে চান, তাহলে একসময় তিনি জনগণের প্রকৃত বক্তব্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি বা দলীয় নেতাদের ব্যর্থতা তার কাছে পৌঁছায় না; তৃণমূলের ক্ষোভ, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং জনমতের পরিবর্তনও অদৃশ্য থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব এমন এক কৃত্রিম বাস্তবতার মধ্যে আটকে পড়তে পারে, যেখানে সবাই তাকে সফল বলছে, অথচ জনগণ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

সমালোচনার প্রয়োজনীয়তা জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করতেন বলেই তার রাজনৈতিক শিক্ষায় আত্মসংশোধনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল বলে মনে করা যায়।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনীতিতে রাজনৈতিক আদর্শ এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। দলীয় নেতাকর্মীদের শুধু কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়; তাদের দলের দর্শন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি এবং জনগণের বাস্তব সমস্যা সম্পর্কেও ধারণা থাকা প্রয়োজন।

এই লক্ষ্যেই রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু প্রশিক্ষণ যদি কেবল নেতার প্রশংসা, আনুগত্যের প্রদর্শন এবং মুখস্থ স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি আর প্রকৃত রাজনৈতিক শিক্ষা থাকে না। সেটি পরিণত হয় ব্যক্তিনির্ভর আনুগত্যচর্চায়।

জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় যে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, তা হলো-রাজনীতিতে প্রশ্ন থাকতে হবে, বিতর্ক থাকতে হবে, যুক্তিনির্ভর ভিন্নমত থাকতে হবে এবং ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সাহস থাকতে হবে।

একটি রাজনৈতিক দল তখনই পরিণত হয়, যখন তার কর্মীরা শুধু নির্দেশ পালন করেন না; তারা দলের আদর্শ বোঝেন, রাষ্ট্রের সমস্যা বিশ্লেষণ করেন, জনগণের কথা শোনেন এবং প্রয়োজন হলে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়েও গঠনমূলক প্রশ্ন তোলেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এ ধরনের প্রশ্ন তোলা অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন সব সময় আরামদায়ক হয় না। আজ বিএনপির সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শক্তি শুধু জনসমর্থন নয়; সাংগঠনিক আত্মসমালোচনার সক্ষমতাও। দলটির ভেতরে কি এমন পরিবেশ রয়েছে, যেখানে একজন কর্মী বা স্থানীয় নেতা যুক্তিসংগতভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন?

কিছু প্রশ্ন তাই সামনে আসে- একজন কর্মী কি তার নেতার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলতে পারেন? একজন জেলা বা মহানগর নেতা কি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন তুলতে পারেন? সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধির মূল্যায়ন কি কেবল আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়, নাকি যোগ্যতা, সততা ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও বিবেচিত হয়?, কোনো নেতা ব্যর্থ হলে তাকে ব্যর্থ বলার সাংগঠনিক সাহস আছে কি? কোনো সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলে দল কি তা সংশোধন করে, নাকি ভুল সিদ্ধান্তকেই সঠিক প্রমাণের জন্য নতুন যুক্তি দাঁড় করানো হয়?

এসব প্রশ্ন কেবল বিএনপির জন্য নয়; বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতের ভিন্নতা দুর্বলতার পরিচয় নয়। বরং মত প্রকাশের নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ একটি দলের সাংগঠনিক পরিপক্বতার পরিচয়।

তোষামোদ নেতৃত্বের বিকল্প নয় 

রাজনীতিতে তোষামোদ নতুন কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতার চারপাশে সব সময় এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা নেতার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নির্ভুল প্রমাণ করতে চান। নেতার বক্তব্যের আগেই তারা হাততালি দেন, সিদ্ধান্তের আগেই সমর্থন জানান, আর সিদ্ধান্তের ফল খারাপ হলে দায় চাপান অন্যের ওপর। এই সংস্কৃতি সাময়িকভাবে নেতৃত্বকে স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি দলকে দুর্বল করে, সিদ্ধান্তকে ত্রুটিপূর্ণ করে এবং জনগণের সঙ্গে দলের দূরত্ব বাড়ায়।

চাটুকার নেতৃত্ব তৈরি করে না; তারা নেতার চারপাশে কৃত্রিম নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। সেই বলয়ের ভেতরে সত্যের প্রবেশ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মী কখনো কখনো নেতৃত্বকে অস্বস্তিতে ফেলবেন। তিনি প্রশ্ন করবেন, আপত্তি জানাবেন, তথ্য তুলে ধরবেন এবং ভুল ধরিয়ে দেবেন। কারণ তার আনুগত্য কেবল কোনো ব্যক্তির প্রতি নয়; তার আনুগত্য আদর্শ, দলীয় নীতি এবং জনগণের স্বার্থের প্রতি। এ জায়গাটিই জিয়ার রাজনৈতিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে নতুন করে আলোচনায় আসা প্রয়োজন।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু জাতীয়তাবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান বা পরিচয়ের নাম নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করার অর্থ শুধু একটি রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা নয়; বরং দেশের মানুষের স্বার্থকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখা।

এখানেই আবার মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আসে- আমরা কি সত্যিই জনগণের কথা শুনছি, নাকি শুধু নিজেদের কথাই শুনছি?

রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় তখনই আসে, যখন দলের ভেতরে সবাই একই কথা বলতে শুরু করে। সবাই একই কথা বলছে মানেই যে সবাই একমত, তা নয়। অনেক সময় এর অর্থ হতে পারে, ভিন্নমত প্রকাশের জায়গাটি সংকুচিত হয়ে গেছে।

১ সেপ্টেম্বর তাই শুধু কেক কাটা, আলোচনা সভা, মিছিল বা শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে বিএনপির জন্য আত্মপর্যালোচনার দিনও হতে পারে। প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় দলটি কী অর্জন করেছে, কোথায় সফল হয়েছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কী শিক্ষা নিয়েছে- তার একটি নির্মোহ মূল্যায়ন প্রয়োজন। এই মূল্যায়নের জন্য দরকার এমন মানুষ, যারা সত্য কথা বলবেন। নেতৃত্বকে খুশি করার জন্য নয়, নেতৃত্বকে সঠিক পথে রাখতে প্রয়োজনে কঠিন কথা বলার সাহস দেখাবেন। জিয়ার রাজনৈতিক প্রশিক্ষণসংক্রান্ত সেই বহুল আলোচিত শিক্ষাটির সারকথা এখানেই- প্রশংসা নয়, সমালোচনা শুনুন। প্রশংসা আত্মতৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু সমালোচনা আত্মসংশোধনের সুযোগ তৈরি করে।

একটি দলকে সব সময় শুধু বিরোধী দল দুর্বল করে না; কখনো কখনো দলের ভেতরের অন্ধ আনুগত্যও তাকে দুর্বল করে। আবার একটি দলকে শুধু জনসমর্থন শক্তিশালী করে না; শক্তিশালী করে নিজের ভুল স্বীকার এবং তা সংশোধন করার সাহস।

বিএনপির সামনে যেমন রাজনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় দায়িত্বও। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং নৈতিক প্রস্তুতিও প্রয়োজন। আর সেই প্রস্তুতির প্রথম শর্ত হলো নিজের ভুল শোনার সাহস।

জিয়াউর রহমান যদি ব্যক্তিগত প্রশংসায় সন্তুষ্ট না হয়ে সমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে থাকেন, তবে তার অনুসারীদের কাছেও সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করা অযৌক্তিক নয়।

তাই বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জিয়ার প্রতি সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধা কেবল ফুল, ব্যানার বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তার রাজনৈতিক শিক্ষাকে বাস্তবে ধারণ করাই হতে পারে প্রকৃত শ্রদ্ধা-তোষামোদ নয়, সমালোচনা। ব্যক্তিপূজা নয়, আদর্শ। অন্ধ আনুগত্য নয়, জবাবদিহি।

আর সর্বোপরি- দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জনগণের স্বার্থ; জনগণের স্বার্থে সবার আগে বাংলাদেশ। এ রাজনৈতিক সংস্কৃতিই হতে পারে জিয়াউর রহমানের প্রতি সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধা এবং বিএনপির আগামী দিনের পথচলার একটি শক্তিশালী ভিত্তি।

লেখক :  সদস্য- এ্যাব

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close