পানি নেই। লাইনে প্রবাহ নেই। মিটারে প্রেজেন্ট রিডিং নেই। অথচ বিল আছে। মাসে মাসে সেই বিল বাড়তে বাড়তে কোনো কোনো গ্রাহকের নামে দাঁড়িয়েছে লাখ টাকা। চট্টগ্রাম ওয়াসার এমন ‘গড় বিলের’ ফাঁদে পড়ে বিপাকে পড়েছে নগরের ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডের ঘাসিয়াপাড়ার শতাধিক পরিবার। এক যুগ ধরে অকার্যকর পানির সংযোগ। তারপরও বিল থামেনি। ৭৮টিরও বেশি সংযোগে এমন বকেয়া বিলের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি টাকা। কোনো গ্রাহকের বিল ৮ লাখ টাকা। আর মৃত মো. ইসকান্দরের একটি সংযোগে ২০২৬ সালের মে মাসে বিল দাঁড়ায় ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৩ টাকা। এতে প্রশ্ন উঠেছে- পানি না দিয়ে বছরের পর বছর এই বিল তৈরি হলো কীভাবে?
২৫২ থেকে ৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা
মৃত মো. ইসকান্দরের (হিসাব নম্বর-১২১৩৩৪) সেমিপাকা ঘরের বিল ছিল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ২৫২ টাকা। এরপর পুরনো সার্ভিস লাইনে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বিল বন্ধ হয়নি। ২০২১ সালের এপ্রিলে বকেয়া দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৬৮২ টাকা। এরপর পানির প্রবাহ শূন্য থাকা অবস্থায় প্রতি মাসে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা করে যোগ হতে থাকে। ২০২৬ সালের মে মাসে সেই বিল দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৩ টাকা।
ইসকান্দরের স্ত্রী রিজিয়া বেগম বলেন, ‘মিটার চার্জ ছাড়া কোনো সেবা না দিয়ে এই লাখ লাখ টাকার ভুতুড়ে বিল দেওয়া সম্পূর্ণ মগের মুল্লুক। ভুতুড়ে বিল মেটাতে গেলে আমাদের মরা ছাড়া উপায় নেই।’ একই মহল্লার মিটার নম্বর ১৭১২৮৩০৫২ (হিসাব নম্বর-১২১৩২৫) নিয়েও রয়েছে একই অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রাহকের বিল পৌঁছেছে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত।
পানি নেই, আছে ‘গড় বিল’
ওয়াসার রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মিটারে প্রেজেন্ট রিডিং না থাকলে আগের তিন মাসের বিলের ভিত্তিতে ‘গড় বিল’ করা হয়। কিন্তু ঘাসিয়াপাড়ায় সমস্যা শুধু রিডিং না থাকার নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এক যুগ ধরে পানির সংযোগই ছিল অকার্যকর। ১৯৮৮ সালে স্থাপিত পুরোনো সার্ভিস লাইনে আয়রন জমে যায়। বন্ধ হয়ে যায় পানির প্রবাহ। অথচ বছরের পর বছর অফিসে বসে ‘গড় বিল’ তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের সরল প্রশ্ন— যেখানে পানি ব্যবহারের সুযোগই ছিল না, সেখানে ব্যবহারের গড় হিসাব এলো কোথা থেকে?
কলসি হাতে বাসিন্দা, খাতায় লাখ টাকা
পানির অভাবে দীর্ঘদিন প্লাস্টিকের কলসি ও জার হাতে ঘুরতে হয়েছে স্থানীয়দের। নির্ভর করতে হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাঁচটি গভীর নলকূপ ও সাতটি পুকুরের পানির ওপর। অথচ ওয়াসার হিসাবে তাদের নামে জমেছে হাজার থেকে লাখ টাকা। ঘাসিয়াপাড়া মহল্লা কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান সুমন বলেন, অন্যায্য বিলের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে লিখিত অভিযোগ করা হয়। ২০২১ সালে দেওয়া হয় আইনি নোটিশ। একই বছর দুদকেও লিখিত আবেদন করা হয়। কিন্তু কোনো প্রতিকার মেলেনি। অভিযোগের পর অভিযোগ। নোটিশের পর নোটিশ। তারপরও থামেনি বিলের অঙ্ক।
‘আন্ডারটেকিং’-এ দায় শেষ ওয়াসার?
ওয়াসার সংযোগ ফরমে সই করা ‘আন্ডারটেকিং’ বা অঙ্গীকারনামার ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে পানি সরবরাহ ব্যাহত হলেও ধার্যকৃত বিল পরিশোধ করতে হবে। এই অঙ্গীকারনামাকেই বিল আদায়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখাচ্ছে ওয়াসা। তবে আইনজ্ঞদের মতে, সেবা না দিয়ে একপক্ষীয় অঙ্গীকারনামার দোহাই দিয়ে বিল আদায় করা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের মতে, বিষয়টি ১৮৭২ সালের চুক্তি আইন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর আলোকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সরকারি দপ্তরের বকেয়া ৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা
চট্টগ্রাম ওয়াসার মোট বকেয়া বিল ২৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি দপ্তরগুলোর কাছেই পড়ে আছে ৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অথচ সাধারণ গ্রাহকের বকেয়া আদায়ে মনিটরিং টিমের তৎপরতা রয়েছে। পানি না পেয়েও যাদের নামে বছরের পর বছর বিল জমেছে, তাদের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে ওয়াসার বকেয়া আদায়ের নীতিতে বৈষম্যের প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘পানির সুবিধা না দিয়ে গড় বিলের নামে এভাবে শত শত পরিবারকে প্রশাসনিক আন্ডারটেকিংয়ের অজুহাতে জিম্মি করা কোনো সেবামূলক সংস্থার কাজ হতে পারে না; এটি সম্পূর্ণ অন্যায্য ও বেআইনি।’
ওয়াসার বক্তব্যেও প্রশ্ন
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) শারমিন আলম বলেন, আন্ডারটেকিংয়ের বাধ্যবাধকতায় বিল কমানোর সুযোগ নেই।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, গ্রাহকদের উচিত ছিল পানি না পেলে আগেই লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। ভবিষ্যতে আর কখনো সংযোগ রাখা হবে না— এমন অঙ্গীকারনামা দিলে তা বাতিল করে দেওয়া হবে। পানি না পেয়েও বিল আসার অভিযোগ তদন্ত করে দেখার আশ্বাসও দেন তিনি।
কেকে/ এমএস