চারদিকে শুধু অন্ধকার। মাথার ওপরে পাহাড়ের ভারী পাথর আর ধ্বংসস্তূপ। বাইরে কী ঘটছে, বেঁচে আছেন কি না—কিছুই জানার উপায় নেই। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে টানা নয় দিন সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে থেকেও হাল ছাড়েননি নেপালের সঞ্জয় শাহ। অবশেষে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) জীবিত উদ্ধার হয়েছেন ৩০ বছর বয়সী এই যান্ত্রিক ফোরম্যান।
উদ্ধারের পর মুখে অক্সিজেন মাস্ক, শরীরে কাদামাটি আর ক্লান্তির ছাপ। স্ট্রেচারে শুয়ে সেনা কর্মকর্তাদের কাছে নিজের সেই ভয়ংকর নয় দিনের কথা জানান শাহ। নেপাল কর্তৃপক্ষ প্রকাশিত ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “আমার দায়িত্ব ছিল সবার জীবন বাঁচানো। এত বড় দুর্ঘটনার সময় আমার পালিয়ে যাওয়া ঠিক হতো না।”
শাহ তখন ছিলেন ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গের কন্ট্রোল রুমে। সেখানে সাধারণত চার থেকে ছয়জন কর্মী থাকেন। কিন্তু সেদিন সেখানে ছিলেন প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন।
দুর্যোগের খবর পাওয়ার পর তিনি অন্যদের দ্রুত সরে যেতে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু সবাইকে নিরাপদে বের করে দেওয়ার আগেই পাহাড় ধসে পথ বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নিজেই আটকা পড়েন অন্ধকার সুড়ঙ্গে।
একসময় হয়তো মনে হয়েছিল, আর কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। তবু আশা ছাড়েননি শাহ। নয় দিন ধরে সেই অন্ধকারের মধ্যেই প্রার্থনার মন্ত্র পাঠ করে নিজেকে সাহস জুগিয়েছেন। সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা আরও তিন-চারজন শ্রমিকের সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগও রাখতে সক্ষম হন তিনি। পাহাড়ের আরও গভীরে অন্য শ্রমিকরা আটকে থাকতে পারেন বলেও জানান শাহ।
অবশেষে উদ্ধারকর্মীরা যখন তাকে খুঁজে পান, তখনও তিনি জীবিত। কাদায় ঢাকা মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু ফিরে আসার স্বস্তি যেন স্পষ্ট। নেপালি সেনাবাহিনীর প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, একজন শ্রমিক তাকে পিঠে করে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে আসছেন।
সঞ্জয় শাহ ও যান্ত্রিক সুপারভাইজার কবির মহারজন ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া প্রথম দুই শ্রমিক। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর অন্য একটি সুড়ঙ্গ থেকেও একটি ছোট দল বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।
ধ্বংসস্তূপের নিচে নয় দিন কাটিয়ে সঞ্জয় শাহর ফিরে আসা তাই শুধু একজন শ্রমিকের বেঁচে যাওয়ার গল্প নয়—এটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও মানুষের আশা, দায়িত্ববোধ আর বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষার এক বিরল গল্প।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ