হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ বন্ধে ইরানের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়ে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় ছিল তেহরান। এর মধ্যেই ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরান এ কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়। তেহরানের দাবি, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এতে সাত দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং অঞ্চলটির বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সংঘাত বন্ধের কথা বলা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘে সাংবাদিকদের ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং আঞ্চলিক সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধের জন্য সাত দিনের সময়সীমা শুরু হবে।
আরাকচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তিতে পৌঁছানো এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিকতা থাকলে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি এখনই রয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হলে যুদ্ধরত পক্ষগুলো পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনায় বসতে পারে বলেও জানান তিনি।
এ ধরনের আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়টিও থাকতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরানকে কখনোই পরমাণু বোমা অর্জন করতে দেওয়া হবে না।’ অন্যদিকে রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রস্তাব গ্রহণ করলেও পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখাবে না তেহরান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর মতো বিষয়ে ইরান কোনো ছাড় দেবে না।’
তবে ইরানের প্রস্তাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধের কথা রয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিতে, দেশটির জব্দ করা অর্থ ছাড় করতে এবং তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে বলে জানান আরাকচি।
এর আগে এক মার্কিন কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছিলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনাগুলো ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ ছিল। তবে *ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল*-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ট্রাম্পের দাবিগুলো পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে সংশয় প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প তার কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, নতুন করে বোমা হামলার সম্ভাবনাকে তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
সৌদি মিত্রদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা
যুদ্ধ বন্ধে এর আগের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো সফল হয়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরুর পর থেকে কয়েক দফা বিরতি ও পুনরায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির দুর্বল অর্থনীতির ওপরও চাপ বেড়েছে।
ইরান ও তার মিত্ররা পাল্টা হামলার মাধ্যমে সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছে। ইরান ওমানের সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরাও সৌদি স্বার্থে হামলা চালিয়েছে।
শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আরাকচি হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা সম্পর্কে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানকে অবহিত করেছেন।
এদিকে যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব মোকাবিলায় সৌদি আরবের মিত্ররাও দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে একসঙ্গে কাজ করছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি যোদ্ধাদের হামলার মুখে রয়েছে। হুথিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি ভূখণ্ডেও আঘাত হেনেছে।
শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা সৌদি রাজধানী রিয়াদের দিকে হুথিদের ছোড়া দুটি ড্রোন এবং খামিস মুশাইত অভিমুখে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্ট করেছে।
ইয়েমেনের জনবহুল অঞ্চলগুলোর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী হুথিরা জুলাইয়ে রিয়াদের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করার পর থেকে সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সৌদি শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌযান। ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে থাকা তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা শুক্রবার রিয়াদে বৈঠক করেছেন। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় এবং বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর এক দিন আগে সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামোর মধ্যে বৈঠক করেন।
অন্যদিকে ইয়েমেনে চলমান সহিংসতার কারণে নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। শুক্রবার সংস্থাটি জানায়, দেশটিতে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির হার বেড়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ