জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘দাদাগিরির মানসিকতা’র অভিযোগ তুলে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তবে সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুদ্ধকালীন ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, “হুমকি দিয়ে ইরানকে নত করা যাবে না; বরং এতে দেশটির সংকল্প আরও দৃঢ় হবে।” চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলে ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার যে হুঁশিয়ারি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্টের আগের দিনের বক্তব্য ‘দাদাগিরির মানসিকতার’ বহিঃপ্রকাশ। ইরানের জনগণ কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পের ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে বর্ণনার প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন তোলেন, যারা সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ দেয়, তারাই আবার ইরানকে সন্ত্রাসী বলছে।”
ভাষণে একাধিকবার পেজেশকিয়ান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে উত্তেজনা নিরসনে ইরান প্রস্তুত।” তবে শক্তি প্রয়োগের ভাষা তেহরান মেনে নেবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
পেজেশকিয়ানের ভাষণ শুরুর সময় জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের জন্য মার্কিন মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ভাষণের শুরুতেই যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগ তোলেন পেজেশকিয়ান। এ সময় একটি শ্রেণিকক্ষে স্কুলছাত্রীদের ছবিসহ কয়েকটি ছবি তিনি তুলে ধরেন।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
মিনাবের ওই হামলার বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) এখনো তদন্তের ফল প্রকাশ্যে প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্সের ৫ মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওই হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী হওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, “ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো উদ্দেশ্য নেই। তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকারও তেহরান ছাড়বে না।” তাঁর ভাষায়, ‘পারমাণবিক অস্ত্রও নয়, পারমাণবিক জ্ঞান ত্যাগও নয়।’
সংঘাত শুরুর সাত মাসে যুদ্ধটি বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলকে আরও বড় যুদ্ধের ঝুঁকির কাছাকাছি নিয়ে গেছে। সামরিক পদক্ষেপে তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করা না যাওয়ার পর ওয়াশিংটন নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বাণিজ্য ও মানুষের আয় কমে যাওয়ার চাপে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি নিয়ে দেশটির নেতারা উদ্বিগ্ন। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বারবার দেখা দেওয়া দেশব্যাপী অসন্তোষ নতুন করে জেগে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার ইরানি সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানায়, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কৌশলগত এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের শর্ত জানিয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘সবাই এই জলপথ থেকে সুবিধা নেবে, অথচ আমাদের সেখানে নৌ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে না—এটা হতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, শত্রুভাবাপন্ন নৌবহরের স্থায়ী মোতায়েন এবং যুদ্ধের বিস্তার শান্তি বয়ে আনবে না।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ