বৃষ্টি নামলেই চেনা চিত্র। পিচঢালা সড়ক যেন মুহূর্তেই পরিণত হয় কাদা-পানির মরণফাঁদে। কোথায় গর্ত, কোথায় খানাখন্দ—পানির নিচে তা বোঝার উপায় নেই। ঝুঁকি নিয়ে সেই গর্ত পেরোতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে মোটরসাইকেল, আটকে যাচ্ছে অটোরিকশার চাকা। প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এটি কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের সড়কের গল্প নয়। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সিন্দুরখান সড়কের বর্তমান চিত্র।
বছরের পর বছর ধরে বেহাল এ সড়কে বারবার চলছে জোড়াতালির সংস্কার। কিন্তু বৃষ্টি এলেই সেই সংস্কারের সব চিহ্ন মুছে যায়। ফিরে আসে গর্ত, কাদাপানি আর দুর্ভোগ। প্রশ্ন উঠেছে—রুটিন মেইনটেইন্যান্সের কাজ যদি শেষই হয়ে থাকে, তাহলে সড়কের এমন দশা কেন।
সরেজমিনে সড়কটির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির পানিতে একাধিক স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ছোট-বড় যানবাহনগুলোকে বাধ্য হয়েই এসব গর্তের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সামান্য অসতর্ক হলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চালকদের জন্য সড়কটি এখন যেন প্রতিদিনের পরীক্ষা। গর্তে চাকা পড়ে যানবাহনের ক্ষতি হচ্ছে। আবার কাদা-পানিতে পিছলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকছে।
সড়কের বেহাল দশায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন জরুরি রোগী বহনকারীরা। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়াজন হলেও খানাখন্দ আর কাদাপানির কারণে গতি কমাতে হচ্ছে যানবাহনকে। কোনো কোনো জায়গায় গর্ত এড়িয়ে চলতেই সময় নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, কোনো রোগীর জরুরি মুহূর্তে এই সড়ক বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশে একই অবস্থা। কখনো মাটি, কখনো ইট কিংবা অন্য উপকরণ ফেলে গর্ত ভরাট করে সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করা হয়। কিন্তু বৃষ্টি এলেই সেই ব্যবস্থা ভেস্তে যায়।
সিন্দুরখান রোডের বাসিন্দা শাহাদাত হোসাইন খান বলেন, ‘এভাবে দায়সারা সংস্কার করে কোনো লাভ নেই। বৃষ্টি এলেই আবার গর্ত আর কাদাপানি তৈরি হয়। সড়কটি পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করে টেকসই সমাধান করতে হবে।’
স্থানীয় গাড়িচালক মনির মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টি হলে গর্তগুলো পানিতে ভরে যায়। কোন জায়গায় কত বড় গর্ত, বোঝা যায় না। গাড়ি চালানো খুব ঝুঁকিপূর্ণ। গর্তে চাকা পড়ে গাড়ির ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা দেখছি।’
শাহজাহানপুর (শিববাড়ি) বাজারের ব্যবসায়ী মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কাজে হাজারো মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করেন। সড়কের এমন অবস্থায় সবার দুর্ভোগ বাড়ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত অর্থবছরে মৌলভীবাজার জেলা এলজিইডির পক্ষ থেকে জেলার বিভিন্ন সড়কের রুটিন মেইনটেইন্যান্সের দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর আওতায় সিন্দুরখান রোডের কাজ পান কুলাউড়ার ঠিকাদার মো. মুহিবুর রহমান (কোকিল)।
তার দাবি, গত মে মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমঙ্গলে আসার আগেই সিন্দুরখান সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন অংশের রুটিন মেইনটেইন্যান্সের কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন।
মো. মুহিবুর রহমান (কোকিল) বলেন, ‘রুটিন মেইনটেইন্যান্সের আওতাভুক্ত নির্ধারিত কাজ ইতোমধ্যে শেষ করা হয়েছে। সড়কের পুরো অংশে নতুন করে কার্পেটিং করা আমাদের প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয়। গর্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভরাটসহ নির্ধারিত মেইনটেইন্যান্সের কাজের মধ্যেই আমাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধী।’
তবে ঠিকাদারের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না এলজিইডির বক্তব্য।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (এলজিইডি) আব্দুর রাকিব বলেন, ‘সিন্দুরখান সড়কটি বড় কোনো প্রকল্পের রুটিন ওয়ার্কে ছিল না। তবে রুটিন মেইনটেইন্যান্সের জন্য কুলাউড়ার এক ঠিকাদার কাজ পেয়েছিলেন। বৃষ্টির কারণে হয়তো পুরোপুরি কাজ শেষ করতে পারেননি। আমরা যোগাযোগ করছি, দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য।
তিনি আরও বলেন, ‘সড়কটির স্থায়ী সংস্কারের জন্য এ বছর একটি প্রকল্প প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে স্থায়ীভাবে সংস্কারকাজ শুরু হবে।’
মৌলভীবাজার জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (এলজিইডি) মোহাম্মদ ফারুক আহমদ বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। সিন্দুরান রোডের রুটিন মেইনটেইন্যান্সের বিষয়টি আমার জানা নেই। ঢাকায় আছি। এসে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে এ সড়কটি সংস্কারের জন্য বরাদ্দ চেয়ে চলতি বছর মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের পর রাস্তা মেরামতের কাজ শুরু হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, বৃষ্টি এলেই গর্ত ভরাটের সাময়িক উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করে পরিকল্পিত ও টেকসই সংস্কার। দ্রুত স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে আগামী বর্ষায় দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
কেকে/এআই