দেশের সারের পর্যপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের অব্যবস্থাপনা ও অবহলোর কারণে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। রোববার সার দিতে দেরি হওয়ায় কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করা হয়।
এ ছাড়া সারের দাবিতে জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় সড়কে এবং লালমনিরহাটে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। এর আগে ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারী শিলখুড়ি ইউনিয়নে বারবার ঘুরেও সার না পেয়ে এক ডিলারের গুদাম ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান কৃষকরা। গতকাল রোববার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার সারের সংকটের মধ্যে কুড়িগ্রাম ও বগুড়ায় অভিযান চালিয়ে কলোবাজারির উদ্দেশ্যে মজুত করে রাখা বিপুল পরিমাণ সার উদ্ধার করেছে প্রশাসন।
দেশে বর্তমানে সারের সংকট নেই বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে বলে জানান তিনি। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। তবে এসময় তিনি অভিযোগ করেন, একটি সংগঠিত চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, গত মৌসুমে একই সময়ে সরকারের কাছে ১২ লাখ টন সার মজুত ছিল। বর্তমানে মজুত রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ টন। অর্থাৎ সরকারি গুদাম ও ওয়্যারহাউসে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, একটি সংগঠিত দল সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া অনিয়মে জড়িত ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন অনিয়ম ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত ডিলারদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। নীতিমালা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, বিভিন্ন সারের বরাদ্দ ও মজুতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। একইসঙ্গে সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
পরিবেশকের গুদাম ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ :
সার দিতে দেরি হওয়ায় কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করেছেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। স্থানীয় কৃষকরা জানান, সার নেওয়ার জন্য সকাল সাতটা থেকে নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারের কাশেম ট্রেডার্সের সামনে কৃষকরা জড়ো হতে থাকেন। সকাল আটটার পরও পরিবেশকের লোকজন না আসায় অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে সেখানে প্রায় ২০০ কৃষক জড়ো হন। সকাল নয়টার দিকে কৃষকরা হইচই শুরু করেন। এ সময় কয়েকজন গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন। তবে অন্যরা বাধা দেওয়ায় গুদাম থেকে কেউ সার নিয়ে যাননি বলে স্থানীয় কৃষকরা জানান।
কৃষকদের কয়েকজন বলেন, গুদামে সার থাকার পরও দীর্ঘ সময় পরিবেশকের লোকজন না আসায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে কৃষকদের মধ্যে ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে কয়েকজন গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন।
কচাকাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অর্পণ কুমার দাস বলেন, পরিবেশকের গুদামে পর্যাপ্ত সার ছিল। পরিবেশক কিছুটা দেরিতে আসায় কৃষকরা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। ১৫০ থেকে ২০০ মানুষের মধ্যে ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে গুদামের বেড়ার টিন ভেঙে যায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সার বিতরণ করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে ভূরুঙ্গামারীর বলদিয়া ইউনিয়নের মিলনবাজারে সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। এতে ওই সড়কে কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেক ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এদিকে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কথিত ‘সার সিন্ডিকেট’ ভাঙার দাবিতে লালমনিরহাটে মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি রেখে অবরোধ করেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। গতকাল বেলা ১১টার দিকে লালমনিরহাট-পাটগ্রাম-বুড়িমারী মহাসড়কের লালমনিরহাট সদরের মহেন্দ্রনগর বাজার এলাকায় এ অবরোধ করা হয়। এতে প্রায় এক ঘণ্টার মতো মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করা আশ্বাসে আন্দোলনরত কৃষকরা অবরোধ তুলে নেন।
গোয়ালঘর, খড়ের মাচা থেকে সার উদ্ধার :
কুড়িগ্রাম ও বগুড়ায় অভিযান চালিয়ে মজুত করে রাখা বিপুল পরিমাণ সার উদ্ধার করেছে প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার রাতে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে দুই ব্যক্তির বাড়ি থেকে ২ হাজার ১৫০ কেজি সার উদ্ধার করা হয়েছে। এসব সার বাড়ির গোয়ালঘর, ধান রাখার ঘর ও খড়ের মাচায় লুকানো ছিল। একই রাতে বগুড়ার আদমদীঘিতে জব্দ করা হয়েছে ১ হাজার ৬৭৫ বস্তা সার। এগুলো কালোবাজারে বিক্রির চেষ্টা চলছিল।
দুই ঘটনায় অভিযুক্তদের জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভূরুঙ্গামারীতে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বগুড়ার আদমদীঘিতে কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে সার মজুতের অভিযোগে এক সার ডিলারকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা ও ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বৃহস্পতিবার রাতে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার চর ভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নের ইসলামপুর এলাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালায় পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন। মো. বেলাল মিয়া ও মো. মানিক উদ্দিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে গোয়ালঘর, খড়ের মাচা ও ধান রাখার ঘরে তল্লাশি করে সারগুলো উদ্ধার করা হয়।
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার নসরতপুর বাজারে অভিযান চালিয়ে দুটি গুদাম থেকে ১ হাজার ৬৭৫ বস্তা সার জব্দ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে নয়টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুমা বেগমের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়।
এ ছাড়া দিনাজপুর, গাইবান্ধ থেকেও অবৈধভাবে মজুত করা বিপুল সার উদ্ধার করে প্রশাসন।
এর আগে গত ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নে এক ডিলারের গুদাম ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন কৃষকেরা। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে ৩৩ জন কৃষক ৩৩ বস্তা সার ফেরত দিয়েছেন।
কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, বারবার ডিলারের কাছে গিয়েও তারা সার পাননি। ডিলারের কাছে সার না পেলেও খোলাবাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল।
কেকে/ এমএস