সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: গণতন্ত্রের জন্য সমঝোতার রাজনীতি করতে হবে : রাষ্ট্রপতি      দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা      ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৮৮      ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      নদীদখল ও দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর      গোপালগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৩      জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
রোহিঙ্গারা এখন বিষফোঁড়া
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:২১ এএম আপডেট: ০৭.০৯.২০২৬ ৯:২৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে এটি বর্তমানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ‘বিষফোঁড়া’ বা বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও, দীর্ঘ ৯ বছরেও তাদের প্রত্যাবাসন হয়নি। ফলে সমস্যাটি দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। এমনকি এ সংকটকে এখন শুধু মানবিক সমস্যা নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিশ্লেষকরাও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
  
রোববার সকালে রাজধানীর বিআইআইএসএস মিলনায়তনে ‘রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের কৌশল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থান বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। একইসঙ্গে এর প্রভাবে আঞ্চলিক নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়ছে। 

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘায়িত আশ্রয় পরিস্থিতি শুধু প্রত্যাবাসনকেই অনিশ্চিত করেনি; বাড়িয়েছে পরিবেশের ওপর চাপ। একইসঙ্গে মাদক ও অস্ত্রের বিস্তার, অপহরণ, মানবপাচার, চাঁদাবাজিসহ ক্যাম্পকেন্দ্রিক নানা অপরাধও দিন দিন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর বোঝা টানতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেমন চাপে পড়েছে, তেমনি কক্সবাজার ও আশেপাশের অঞ্চলের বনভূমি ধ্বংস এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তাও হুমকিতে পড়ছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু শরণার্থী আশ্রয়ের বিষয় নয়। এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক, মানবপাচার, পরিবেশ, স্থানীয় অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। 

২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারি হিসাব ও ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এর মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে রয়েছেন প্রায় ১১ লাখ ৬৬ হাজার এবং ভাসানচরে প্রায় ৩৪ হাজার।

২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবিক সহায়তা দিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, প্রশাসন, অবকাঠামো, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের পরোক্ষ অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি হয়েছে।

২০২৬ সালে বেসরকারি একটি সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাম্পের কাছাকাছি এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান বেড়েছে, একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ভূমি ব্যবহারের ওপর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিতে আসল চাপ কোথায়?

রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাংলাদেশে এলেও সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। প্রথমত, প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পের বাইরে সড়ক, যোগাযোগ, বাজার, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জনসেবায় অতিরিক্ত চাপ। তৃতীয়ত, বন ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারে বাড়তি সরকারি ব্যয়। চতুর্থত, স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা ও মজুরি কাঠামোর পরিবর্তন। পঞ্চমত, মাদক ও মানবপাচারের মতো সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত তৎপরতা।

তবে অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থার ব্যয় স্থানীয় বাজারেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করছে। ডব্লিউ এফপি’র তথ্য বলছে, রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তার জন্য স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও পণ্য কেনা হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ তৈরি করে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইউনিসেফ জানায়, রোহিঙ্গাদের জন্য বৈশ্বিক সহায়তার পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে কমে এসেছে, যার ফলে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে এবং স্থানীয় অনেক মানুষ চাকরি হারাচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাড়াচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) অনুদান বন্ধের ঘোষণার পর বেশ কিছু এনজিও তাদের কর্মীদের ছাঁটাই করেছে এবং কিছু শিক্ষাকেন্দ্রে তহবিল বন্ধ হয়ে গেছে। 

নানা অপকর্মে জড়িত রোহিঙ্গারা

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এখন মাদকের হটস্পট। ইয়াবা ও আইস পাচারের পাশাপাশি অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মানব পাচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।  

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক দফতরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রবেশ করা মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। 

কক্সবাজার জেলা পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, বিগত ৯ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হত্যা, মাদক, অপহরণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে এবং এতে আসামি করা হয়েছে ১০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গাকে। 

বিদেশি পিস্তলসহ আরসা সদস্য গ্রেপ্তার

কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ মোহাম্মদ জহির (১৯) নামে আরসার এক সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। 

র‌্যাব-১৫ জানায়, গত শুক্রবার রাতে ১১নং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প এলাকা তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। গত ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সশস্ত্র তিনটি গোষ্ঠীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় মা-ছেলে গুলিবিদ্ধ হন। 

ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা বলেন, সন্ধ্যায় শুরু হওয়া এ গোলাগুলি রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত থেমে থেমে চলছিল।

রোহিঙ্গা নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ক্যাম্পগুলোতে শতাধিক নতুন মাদক আখড়া গড়ে উঠেছে। বর্তমানে চার শতাধিক স্থানে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বিক্রি ও সেবন চলছে। অভিযানের ঘাটতিকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো।

উখিয়া পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা এখন বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ইয়াবা, অস্ত্র ও  নানাবিধ অপরাধের পাশাপাশি স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধে জড়াচ্ছে। এসব রোহিঙ্গাকে দ্রুত প্রত্যাবাসন জরুরি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা ১৪ আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সিরাজ আমিন বলেন, ‘১৫ লাখ মানুষের মধ্য থেকে আসামিদের নিয়ন্ত্রণ এবং চিহ্নিত করা কঠিন। তবে ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক ভালো।’

এদিকে মানবপাচারও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, যেখানে রোহিঙ্গারা প্রধান লক্ষ্য। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা রোহিঙ্গাদের মানবপাচারের ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সালে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন, যার মধ্যে প্রায় ৯০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা, মানবপাচার ও রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান।

বাড়ছে পরিবেশ ঝুঁকি

রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে কক্সবাজারের পাহাড়ি বনাঞ্চলের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বন অধিদফতরের একটি প্রকল্প-সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা আগমনের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ওপর ব্যাপক মানবিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এসব এলাকায় ৮ হাজার একরের বেশি বনভূমি অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। 

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন ১৪০ টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হয় এবং প্রায় অর্ধেক পরিবার নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থানে বর্জ্য পৌঁছাতে পারে। ফলে বর্ষায় ড্রেন বন্ধ হওয়া, জলাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর মানবিক বিষয় নয়। এটি দিনদিন বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট সমাধানের জন্য টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। 

সম্প্রতি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেন ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির এশিয়া অঞ্চলের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসিনা রহমান। রাজধানীর হোটেল শেরাটনে এক অনুষ্ঠানে তিন বলেন, মানবিক এই সংকটের নয় বছর পার হলেও আগের গতানুগতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। সংকটের টেকসই সমাধানে সম্মিলিতভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  রোহিঙ্গা   বিষফোঁড়া  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close