মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। মন্দির, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি হাসপাতাল—কোথাও যেন নিরাপত্তা মিলছে না। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে শ্রীমঙ্গল শহর ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ১৫টির বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে রয়েছে একাধিক ছিনতাই। এর মধ্যে একই রাতে চারটি মন্দির ও ঠাকুরঘরে চুরি এবং দিনের বেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষ ধরনের স্প্রে ছিটিয়ে এক নারীর গলার স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধারাবাহিক এসব ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা বাড়লেও চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধে দৃশ্যমান তৎপরতা যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
টিনের চাল কেটে দোকানে চুরি
গত ২৫ আগস্ট শ্রীমঙ্গল শহরের রেলকলোনির মাজারের গলি ও স্টেশন রোড এলাকায় পৃথকভাবে দোকান ও মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে।
এর পাঁচ দিন পর, ৩০ আগস্ট রাতে শহরের ভানুগাছ রোডের হাতিম ফার্নিচার মার্কেটে ঘটে আরও বড় চুরি। দুর্বৃত্তরা মার্কেটের তিনটি দোকানের টিনের চাল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। ‘শ্রীমঙ্গল বাইক রেন্ট পয়েন্ট’ থেকে নগদ টাকা ও জ্বালানি তেল এবং ‘হাতিম ফার্নিচার’ থেকে নগদ ৭০ হাজার টাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায় তারা।
পর্যটক দম্পতিকে চাকু ধরে ৫০ হাজার টাকা ছিনতাই
চুরির পাশাপাশি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে প্রকাশ্যে। ৩০ আগস্ট শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা এক পর্যটক দম্পতিকে ভাড়াউড়া এলাকায় নিয়ে গলায় চাকু ধরে ৫০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ধাওয়া করে তিনজনকে আটক করেন। পরে তাঁদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তালাবদ্ধ বাসা, লক ভেঙে তিন লাখ টাকার গয়না চুরি
গত ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে পৌর এলাকার সবুজবাগ আবাসিক এলাকায় চাকরিজীবী ঝিনুক সরকারের চারতলার বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীর স্ত্রী সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে বাসায় তালা দিয়ে বাইরে যান। এই সুযোগে চোরেরা দরজার লক ভেঙে ঘরে ঢোকে। পরে ঘরে থাকা আনুমানিক তিন লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণ ও রুপার গয়না নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় শ্রীমঙ্গল থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
এক রাতে চার মন্দির ও ঠাকুরঘরে চুরি
চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভুনবীর ইউনিয়নে। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে ইউনিয়নের ভিমসী গ্রামে চারটি ধর্মীয় স্থাপনায় চুরির ঘটনা ঘটে। চোরেরা মদন মোহন জিউর আখড়া, সুভাষ রায়ের ঠাকুরঘর, সজল দাশের ঠাকুরঘর এবং পালপাড়া সার্বজনীন শ্মশান কালীমন্দিরে ঢুকে প্রণামির বাক্স ভেঙে নগদ টাকা নিয়ে যায়। পাশাপাশি পূজার কাজে ব্যবহৃত পিতল ও কাঁসার বাসনপত্র, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রীও নিয়ে যায় তারা। একটি মন্দির থেকে পিতলের গোপালমূর্তি চুরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এর মাত্র দুই দিন পর, ৫ সেপ্টেম্বর রাতে একই ইউনিয়নের শাসন গ্রামে আরও চারটি ধর্মীয় স্থাপনায় চুরি হয়। সেগুলো হলো—শ্রীশ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, শ্রী মানবেন্দ্র ভট্টাচার্যের বাড়ির ঠাকুরঘর, নারায়ণ ভট্টাচার্যের বাড়ির ঠাকুরঘর এবং সুধা ভট্টাচার্যের বাড়ির ঠাকুরঘর। ফলে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে একই ইউনিয়নের অন্তত আটটি মন্দির ও ঠাকুরঘর চুরির শিকার হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আগেও এক রাতে একাধিক মন্দিরে চুরি
স্থানীয় লোকজন বলছেন, ভুনবীর এলাকায় মন্দির ও ঠাকুরঘরে চুরি নতুন নয়। এর আগেও এক রাতে সাত থেকে আটটি মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছিল। তবে সেসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, ভুনবীর ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ দেব বলেন, ‘আমরা বারবার পুলিশকে বলেছি, এলাকায় মাদকাসক্তের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আমাদের ধারণা, মাদকাসক্তরাই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। চোরেরা মন্দিরের পূজার বাসনপত্র, দানবাক্স, বাদ্যযন্ত্র এবং মদন মোহন জিউর আখড়ায় প্রতিষ্ঠিত পিতলের গোপালমূর্তিও নিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, এর আগেও এই এলাকায় এক রাতে সাত থেকে আটটি মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু তখন কোনো চোরকে ধরা যায়নি। একের পর এক ঘটনায় এখন এলাকার মানুষ আতঙ্কিত। দ্রুত চোরদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারের দাবি জানান তিনি।
এবার সরকারি হাসপাতালেও ছিনতাই
চোর-ছিনতাইকারীদের তৎপরতা এখন শুধু বাসাবাড়ি, দোকান কিংবা মন্দিরে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি হাসপাতালেও ঘটেছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। গতকাল রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর গলার লকেটসহ প্রায় এক ভরি দুই আনা ওজনের স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য আরিফ বাশারের ভাষ্য, তিনজন নারীর একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিশেষ ধরনের স্প্রে ব্যবহার করে ওই নারীর গলা থেকে সুকৌশলে চেইন খুলে নিয়ে যায়। ঘটনাটি এত নিখুঁতভাবে ঘটানো হয় যে আশপাশে থাকা কেউ বিষয়টি বুঝতে পারেননি।
হাসপাতালে আনসার সদস্য থাকার পরও দিনের বেলায় এমন ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগীর স্বজন ও রোগীদের মধ্যেও এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহভাজন নারীদের দেখা গেছে। ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপের প্রক্রিয়া চলছে।
মাদকাসক্তদের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ
চুরি-ছিনতাইয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সম্পর্কে শ্রীমঙ্গল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে। ভুনবীরের মন্দিরগুলোতে চুরির ঘটনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেবায়েত ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মন্দিরগুলোতে পাহারার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, এখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এছাড়া অন্যান্য চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।’
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাসাবাড়ি, দোকান, মন্দির, পর্যটক এবং সরকারি হাসপাতাল—সব জায়গায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায় শ্রীমঙ্গলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু ঘটনার পর তদন্ত নয়, চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধে নিয়মিত টহল, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং সন্দেহভাজন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে মন্দির ও জনসমাগমস্থলগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শ্রীমঙ্গল পর্যটননির্ভর এলাকা হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
কেকে/ এমএস