নীলফামারী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে শিক্ষক বদলি ও সংযুক্তি (ডেপুটেশন) নিয়ে একের পর এক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। গত ২০ আগস্ট জারি করা একটি বিতর্কিত বদলি আদেশে (স্মারক নং-উপপ্রাশিপ/সদর/নীল/৮২৪) অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও নথি সামনে আসার পরও জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে ‘খতিয়ে দেখা হচ্ছে’ বলে জানানো হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই বদলি আদেশে অন্তত দুটি গুরুতর অনিয়ম রয়েছে। এর একটি হলো, বদলির দিন উপজেলা শিক্ষা অফিসে ডেপুটেশনে থাকা এক শিক্ষক নিজ বিদ্যালয় টুপামারীতে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণ না করেই সরাসরি নতুন কর্মস্থল মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বের প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়ন বা সুপারিশ ছাড়াই প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মাধ্যমে বদলি সম্পন্ন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো তদন্ত হয়নি।
অন্যদিকে, দাঁড়িহারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তরণীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হওয়া এক শিক্ষিকা দীর্ঘদিন কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বের সংযুক্তি বাতিল না করেই তাকে বদলি করা হয়েছে। এমনকি বদলির পরও তিনি ২৩ আগস্ট পর্যন্ত কচুয়া বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ওই শিক্ষিকাকে হঠাৎ সরিয়ে নেওয়ায় কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৮১ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। এতে পাঠদানসহ বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা।
এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে বদলি কমিটির সদস্য সচিব ও সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জছিজুল আলম মন্ডলের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কার্যকর কোনো ব্যাখ্যা দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এর আগে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানিয়েছিলেন, বদলির ‘পদ্ধতি সঠিক নয়’ এবং বিষয়টি ‘খতিয়ে দেখা হচ্ছে’। তবে এরপর বেশ কিছু সময় পার হলেও তদন্তের অগ্রগতি বা দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট অনিয়মের তথ্য সামনে আসার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ এর পেছনে শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশের অভিযোগও তুলছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
পুরোনো অভিযোগও তদন্তের বাইরে
শুধু সাম্প্রতিক বদলি আদেশ নয়, নীলফামারী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের বিরুদ্ধে এর আগেও নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জাল চিঠির মাধ্যমে অবৈধ শিক্ষক ডেপুটেশন, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও ভোটকেন্দ্র সংস্কারের সরকারি বরাদ্দে অনিয়ম, কন্টিনজেন্সি বিল আত্মসাৎ এবং ভাউচারে অতিরিক্ত ভ্যাট কর্তনের মতো বিষয়।
এ ছাড়া অর্থের বিনিময়ে কিন্ডারগার্টেনের অবৈধ অনুমোদন, সরকারি বই বিক্রি এবং প্রশ্নপত্র বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এসব অভিযোগের অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও কার্যকর তদন্ত বা দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে নীলফামারী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বদলি ও ডেপুটেশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
তাদের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি না হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে শিক্ষক বদলি ও ডেপুটেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কেকে/ এমএস