দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা। বিষয়টি এবার আরও বেশি স্পষ্ট হয়েছে দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে। এক বছরের ব্যবধানে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমেছে ১২ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এবার পাস করেছে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থী, গত বছর যা ছিল ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, ২২৬টি মাদ্রাসার কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। ৪ হাজার ৪৬০টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ার ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের অবহেলা, বৈষম্য, শিক্ষার্থী সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও কমেছে। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, ২৫৬টি মাদ্রাসার পাসের হার ১ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে, ৬০৩টির ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং ৩ হাজার ৬০১টির ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ বড় একটি অংশের প্রতিষ্ঠানেই অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সংকটের শিকড় দাখিল পর্যায়ে নয়, আরও নিচে। দাখিল মাদ্রাসাগুলো মূলত ইবতেদায়ি পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থী পায়। কিন্তু ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও নীতিগত সহায়তার দিক থেকে পিছিয়ে। ফলে প্রাথমিক স্তরেই শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পরবর্তী শিক্ষাজীবনে।
ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো সুযোগ-সুবিধা নেই। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ধর্মীয় বা পারিবারিক বিশেষ কারণ ছাড়া অনেক অভিভাবক সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। এতে মাদ্রাসাগুলো মেধাবী শিক্ষার্থী হারাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে তুলনামূলক দুর্বল শিক্ষার্থীদের নিয়েই দাখিল পর্যায়ে যেতে হচ্ছে তাদের। সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবেই তৈরি হচ্ছে একটি দুষ্টচক্র।
ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। জাতীয়করণ তো দূরের কথা, একটি ইবতেদায়ি মাদ্রাসাকেও এমপিওভুক্ত করা হয়নি। এরপর একাধিকবার জাতীয়করণের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বছরের পর বছর নানা সংকটের মধ্যেই চলছে এসব প্রতিষ্ঠান।
রাজধানীর দারুল উলুম আহসানিয়া কামিল মাদ্রাসার আরবি শিক্ষক মাকসুদুল হাসান বলেন, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায় না। স্থানীয় ধনবান ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। ইবতেদায়ি শিক্ষার্থীরাও নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে শুরুতেই মেধাবী শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। এর প্রভাব পড়ে পরবর্তী ধাপে এবং এসব শিক্ষার্থীরাই পরে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে খারাপ ফলাফল করে।
তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, মিড-ডে মিল ও বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তকের সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে মেধাবী খুদে শিক্ষার্থীরা ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় আসবে না। ফলে দাখিলসহ অন্যান্য পরীক্ষায় ভালো ফল করা কঠিন হবে।
রাজধানীর তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক মাকসুদুর রহমান বলেন, প্রান্তিক অঞ্চলের ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোর উন্নয়ন না হলে সেখানকার শিক্ষার্থীদেরও উন্নয়ন হবে না। এসব ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণ করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
কুমিল্লার নৈয়াইর ইসলামীয়া ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আব্দুল মোমেন বলেন, প্রতিষ্ঠিত পরিবারের ছেলেমেয়েরা ভালো স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করছে। অনেকে ভালো মাদ্রাসায়ও ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, দারুননাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদ্রাসা ও জামেয়া কাসেমিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা মাদ্রাসাগুলোতে মূলত হতদরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারের সন্তানরাই পড়াশোনা করে। তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষায় সরকারের সুনজরও কম। ইবতেদায়ি পর্যায়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো উপবৃত্তি, খাবার ও পোশাক দেওয়া হয় না। পরিবার ও সরকার সচেতন না হলে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়।
মাদ্রাসা শিক্ষায় ফল বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষায় মনোযোগ কম থাকায় শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়টি পিছিয়ে রয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একইসঙ্গে আরবি, কুরআন-হাদিসসহ ধর্মীয় বিষয় পড়তে হয়। এর পাশাপাশি ইংরেজি, গণিতসহ সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলোও পড়তে হয়। ফলে অন্যান্য শিক্ষার্থীর তুলনায় তাদের পড়াশোনার চাপ বেশি। এর মধ্যে সময়ের স্বল্পতা, কোভিডকালীন শিক্ষার ঘাটতি এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলনের কারণে তৈরি হওয়া লার্নিং গ্যাপও তাদের মধ্যে রয়ে গেছে।
তবে এবারের ফল বিপর্যয়ের পেছনে পরীক্ষার ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনকেও কারণ হিসেবে দেখছেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ ছাদেকুর রহমান। তিনি বলেন, পরীক্ষার সময় কড়াকড়ি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে পাসের হার কিছুটা কমেছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা না দিয়ে অন্য কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ায় অনিয়ম কমানো সম্ভব হয়েছে, যা ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জোবায়ের মো. এহসানুল হক বলেন, মাদ্রাসাগুলোতে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। তাহলে মেধাবী খুদে শিক্ষার্থীরা এ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হবে। এতে মাদ্রাসাগুলোর ভালো ফলাফলের সম্ভাবনাও বাড়বে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন) মো. আবুল কালাম তালুকদার বলেন, মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, আরবি, চীনা ও জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ভোকেশনাল শিক্ষার প্রসার এবং আধুনিক যুগোপযোগী বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হবে। তিনি বলেন, এখন মূলত অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে অন্যান্য উন্নয়নমূলক বিষয়ও যুক্ত হবে। কোনো সমস্যার সমাধান খুব দ্রুত সম্ভব নয়। সরকার যত দ্রুত এসব বিষয়ে মৌলিক নির্দেশনা দেবে, তত দ্রুত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
তবে দাখিলের এবারের ফলাফল বলছে, মাদ্রাসা শিক্ষার সংকট কেবল অবকাঠামো দিয়ে সমাধানের নয়। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, মেধাবী শিক্ষার্থী ধরে রাখা, শিক্ষার মান বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ না এলে এ সংকট কাটবে না। বরং ফলাফলের খাতায় প্রতি বছরই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে মাদ্রাসা শিক্ষার পিছিয়ে পড়ার চিত্র।
কেকে/ এমএস