বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি ইতিবাচক বার্তাই দিচ্ছে ভারত। অন্তত ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার দীনশে ত্রিবেদী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু ত্রিবেদী যখন ঢাকায় সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে বেড়াচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে সীমান্তে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। পুশইন, সীমান্তহত্যাসহ নানা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বাহিনীটি। এতে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সীমান্তে নানা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ। প্রায়শই ভারতের কেন্দ্রীয় এ বাহিনীটির গুলিতে নিহত হচ্ছেন বাংলাদেশি নাগরিক। এ ছাড়া অবৈধভাবে নিজ দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার বারবার আপত্তি সত্ত্বেও এ তৎপরতা বন্ধ হচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত। দুই দেশের সম্পর্ক যদি ইতিবাচকভাবে এগোয় এতে দুই দেশই সমানভাবে লাভবান হবে। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গঠনে আগ্রহী নয়। দীর্ঘদিন দেশটির কেন্দ্রীর শাসকরা মূলত আওয়ামী লীগের স্বার্থে কাজ করে গেছে। এতে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতকে নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তবে এখনো দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সম্ভব।
সম্প্রতি দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর বিএনপি সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে যাচ্ছেন। তিনি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন। তার কিছু কিছু বক্তব্যে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি গত পরিবর্তনের আভাসও পাওয়া গেছে। তিনি দুই দেশের জনগণের স্বার্থের ভিত্তিতে কাজ করার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
গত রোববার সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নয়, এটি আত্মার। বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সংগীত ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশ হিসেবে উল্লেখ করে হাইকমিশনার কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় আরও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিকমানের অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এর আগে গত বুধবার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক নির্মাণে ভারত সরকার আগ্রহী। তিনি বলেছেন, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও জোরদার করার মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করতে চায় ভারত।
কিন্তু ত্রিবেদীর এ সম্প্রীতির বার্তা কৌতুকে পরিণত হয়, যখন তার সরকারেরই কেন্দ্রীয় বাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তে আগ্রাসণ চালায়। যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত দিনাজপুর সীমান্তে অর্ধশতাধিক নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা। তাদের এ চেষ্টা অবশ্য ঠেকিয়ে দিয়েছে বিজিবি ও স্থানীয় জনতা। এ ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার দাউদপুর সীমান্ত দিয়ে ৬০ থেকে ৭০ জন নারী-পুরুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। গত রোববার রাত ১০টার দিকে জয়পুরহাট ব্যাটালিয়নের (বিজিবি ২০) আওতাধীন দাউদপুর সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তের ২৮৯/৫১এস ও ২৮৯/৫৬এস সীমানা পিলার থেকে ২০-৩০ গজ দূরে ভারতের ভেতরে নিচা গোবিন্দপুর এলাকায় ওই নারী-পুরুষেরা বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছেন।
দক্ষিণ দাউদপুর গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মইনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কয়েকজন নারী-পুরুষকে দাউদপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। বিষয়টি জানতে পেরে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় বিজিবি তা প্রতিহত করে। এর পর থেকে সীমান্তে বিজিবি, গ্রাম পুলিশ, আনসার সদস্য ও গ্রামবাসী সতর্ক অবস্থানে আছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহাফুজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের জীবন থাকতে ভারতের কোনো মানুষকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে দেব না। প্রয়োজনে গ্রামবাসী লাঠি হাতে সারা রাত সীমান্ত পাহারা দেব।’
বিজিবির প্রচেষ্টায় বিএসএফ একজনকেও বাংলাদেশে পাঠাতে পারেনি বলে জানান দাউদপুর বিজিবি বিওপি ক্যাম্পের কমান্ডার নায়েক সুবেদার মাহাবুবুর রহমান। গ্রামবাসীও বিজিবিকে সহযোগিতা করেছেন। তাদের বাধার মুখে ভারত থেকে বাংলাদেশের দিকে আসা লোকজন আর এগোতে পারেনি।
সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার আহ্বান : এদিকে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ত্রিবেদী। এ সময় জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া সুদৃঢ় করার জন্য সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। বৈঠকে তিনি গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার আহ্বান জানান। উপদেষ্টা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক’ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান ভারতীয় হাইকমিশনারের দক্ষ নেতৃত্বে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।
কেকে/ এমএস