বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ছয় মাস আগে। আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়েছেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতারাও। কিন্তু এখনো ঘোষণা করা হয়নি নতুন কমিটি। নতুন নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও শেষ মুহূর্তে এসে কমিটি গঠন প্রক্রিয়া থমকে গেছে। এরই মধ্যে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন সাবেক ছাত্রনেতারা। বিশেষ করে শীর্ষ দুই পদে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
পদপ্রত্যাশীদের রাজনৈতিক অতীত, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বলয়ের সমর্থন ও শেষ মুহূর্তের তদবিরে জটিল হয়ে উঠেছে কমিটি গঠনের সমীকরণ। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ ‘সিন্ডিকেট’ রাজনীতিই এখন নতুন কমিটি ঘোষণার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান অনেক ছাত্রনেতারা বলছেন, গতানুগতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারা থেকে বেরিয়ে ছাত্রদলকে আধুনিক ও স্মার্ট ছাত্রসংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শুধু মিছিল-মিটিং ও দলীয় কর্মসূচিনির্ভর রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী, দক্ষ ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সংগঠনে যুক্ত করতে হবে।
তারা মনে করেন, সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন এসেছে। তাই ছাত্রদলকে শিক্ষা, গবেষণা, ক্যারিয়ার, প্রযুক্তি, মানবাধিকার, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও জাতীয় ইস্যুতে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। একইসঙ্গে সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনে ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।
সাবেক ছাত্রনেতাদের একটি অংশের মতে, ছাত্রদলের সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করাও জরুরি। মূল দলের নেতাদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে অনেক সময় ছাত্রসংগঠনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের কমিটি গঠন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতৃত্ব নির্বাচন পর্যন্ত মূল দলের সরাসরি প্রভাব কমিয়ে সংগঠনের নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে নেতৃত্ব নির্বাচনে তদবির, গ্রুপিং ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের পরিবর্তে সাংগঠনিক যোগ্যতা ও মাঠের রাজনীতিতে ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, এবার ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর বিষয়টিকে। অতীতে ছাত্রলীগ বা ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন কেউ যাতে কৌশলে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ঢুকতে না পারেন, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে দলীয় অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনের একাধিক নেতা বলছেন, শুধু যাচাই-বাছাই নয়, নতুন কমিটির শীর্ষ পদ ঘিরে অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনও সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করছে। সাবেক ও বর্তমান প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দের প্রার্থী, বিভিন্ন বলয়ের সমর্থন এবং পদপ্রত্যাশীদের নিজস্ব লবিংয়ের কারণে শেষ মুহূর্তে সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।
ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী কয়েকজন নেতা জানান, সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে গোয়েন্দা ও দলীয় পর্যায়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে—এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এবার যাচাইয়ের পরিধি তুলনামূলকভাবে বেশি। আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, শিক্ষাজীবনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকা ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। সেই তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে কারা শীর্ষ নেতৃত্বে আসবেন, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদনের পরই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু খোলা কাগজকে বলেন, ‘ছাত্রদল ছাত্র রাজনীতি এবং ছাত্রদের সঙ্গে থাকবে। ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা, বিভিন্ন ঘটনাবলি যেগুলো ছাত্রদের ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেসব বিষয় নজরে রেখে তাদের পাশে দাঁড়াবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় অচলাবস্থা যাতে না হয়, সেগুলো মোকাবিলায় যে রাজনীতি ও আন্দোলন, ছাত্রদল তা করবে।’ তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের স্বৈরশাসনের পর বিএনপি ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার এসেছে, তা দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল। এ সরকারকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিতে ছাত্রদলকে ভূমিকা রাখতে হবে। এমন ছাত্রদল আমরা চাই।
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘যে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত, এমন উপযুক্ত নেতৃত্বই’ ছাত্রদলে আসা উচিত। তিনি আরও বলেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সাবেক ছাত্রনেতারাও আগামী দিনে ছাত্রদের সমস্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, আগামী দিনে ছাত্রদের সমস্যাকে মোকাবিলা করার মতো নেতৃত্ব’ ছাত্রদলে আসবে।
শীর্ষপদে আলোচনায় যারা :
ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে পারেন, এমন বেশ কয়েকজন নেতার নাম নিয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, সহসভাপতি মঞ্জরুল আলম রিয়াদ, খোরশেদ আলম সোহেল, তৌহিদুর রহমান আউয়াল, মো. কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, ইজ্জাজুল কবির রুয়েল, এইচএম আবু জাফর এবং যুগ্ম সম্পাদক গাজী সাদ্দাম হোসেন।
এ ছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা মমিনুল ইসলাম জিসান, রাজু আহমেদ, ফারুক হোসেন, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও সালেহ মোহাম্মদ আদনানের নামও আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি আজিজুল হক জিয়ন এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্সের নামও সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদার নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন ইশরাক।
শীর্ষ পদে তীব্র প্রতিযোগিতা :
নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ ঘিরে ছাত্রদলের ভেতরে প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বেশি। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক শীর্ষ নেতা ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের সাবেক ও বর্তমান নেতারা আলোচনায় রয়েছেন।
পদপ্রত্যাশীদের কেউ দীর্ঘদিনের রাজপথের কর্মসূচিতে ভূমিকার বিষয়টি সামনে আনছেন। কেউ আবার সাংগঠনিক দক্ষতা ও বিভিন্ন ইউনিটে সংগঠন শক্তিশালী করার অভিজ্ঞতাকে নিজেদের যোগ্যতা হিসেবে তুলে ধরছেন। ফলে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে সময় লাগছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
এদিকে পদপ্রত্যাশীদের অনেকেই নয়াপল্টন ও গুলশানকেন্দ্রিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক ভূমিকার তথ্য তুলে ধরছেন তারা। কেউ কেউ নিজেদের পক্ষে বিভিন্ন ইউনিটের নেতাদের সমর্থন আদায়েরও চেষ্টা করছেন।
পছন্দের প্রার্থী নিয়ে দৌড়ঝাঁপ :
কমিটি বিলম্বের পেছনে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ ‘সিন্ডিকেট’ রাজনীতির কথাও সামনে আসছে। সংগঠনের একাধিক নেতার অভিযোগ, প্রভাবশালী সাবেক ও বর্তমান নেতাদের পৃথক বলয় রয়েছে। এসব বলয়ের পছন্দের প্রার্থীকে শীর্ষ পদে বসানোর চেষ্টা থাকায় সমঝোতা হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদপ্রত্যাশী নেতা বলেন, ‘শুধু প্রার্থীর যোগ্যতা দিয়ে সব সময় হিসাব হয় না। কে কার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, কোন সিনিয়র নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে, কার পক্ষে কে কথা বলছেন, এসব বিষয়ও আলোচনায় থাকে। এখন শেষ মুহূর্তে অনেকেই নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর জন্য চেষ্টা করছেন।’
আরেক নেতা বলেন, ‘সাবেক নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্যে না এলেও তাদের অনুসারীরা সক্রিয়। তারা নিজেদের পছন্দের নেতাকে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন।’
পারিবারিক পরিচয়ও যাচাই :
এবার প্রার্থীদের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবারের কোনো সদস্য ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন কি না, অতীতে কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেসব বিষয়েও তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
বিদায়ী নেতৃত্বকে মূল্যায়নের আশ্বাস :
নতুন কমিটি গঠনের আগে গত ১৩ আগস্ট রাতে বিএনপির চেয়ারম্যানের গুলশান কার্যালয়ে ছাত্রদলের বিদায়ী শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। বৈঠকে ছাত্রদলের বিদায়ী সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির, সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মো. ইয়াহিয়া, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম ও সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। বিদায়ী নেতৃত্বকে ভবিষ্যতে বিএনপির মূল দলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে মূল্যায়ন করা হবে বলেও আশ্বস্ত করা হয় বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। একইসঙ্গে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নতুন নেতৃত্ব বের করে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নেতৃত্বের জট তৈরি না করে দ্রুত সাংগঠনিক প্রক্রিয়া শেষ করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
কেকে/ এমএস