দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় প্রতিদিনই সার নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষ ও বিক্ষোভের খবর আসছে। কুড়িগ্রামের রৌমারী, ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী কিংবা লালমনিরহাটে সার না পেয়ে কৃষকেরা রাস্তা অবরোধ করছেন, ডিলারের গুদামে ভাঙচুর চালাচ্ছেন, এমনকি কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটছে।
একদিকে সরকার বলছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই, বরং গত বছরের তুলনায় মজুত বেশি। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা বলছেন, বারবার ডিলারের কাছে গিয়েও তাঁরা নির্ধারিত মূল্যে সার পাচ্ছেন না, অথচ খোলাবাজারে বাড়তি দামে একই সার মিলছে। এই দুই বয়ানের মধ্যকার ফারাকই প্রমাণ করে, সমস্যাটি নিছক জোগানের নয়—বণ্টন ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম যেমন আছে, তেমনি আছে জবাবদিহিতার ঘাটতি।
সরকারি হিসাবে সারের মজুত পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কৃষক পর্যায়ে তা পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে। গুদাম থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর মাঝের ধাপগুলোতেই ফাঁকফোকর তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক অভিযানে ঘরবাড়িতে লুকিয়ে রাখা কিংবা গুদামে অতিরিক্ত মজুত করা সারের বড় চালান উদ্ধারের ঘটনা এই আশঙ্কাকেই সমর্থন করে।
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা যদি সত্যিই থেকে থাকে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক নয়, ব্যবসায়ীদের নৈতিক ব্যর্থতাও।
সার কৃষকের কাছে সাধারণ কোনো পণ্য নয়। ফসল উৎপাদনের এই অপরিহার্য উপকরণ সময়মতো না পেলে গোটা মৌসুমের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে, ফলন কমে, ঋণের বোঝা বাড়ে। তাই সরকারনির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে সার না পাওয়ার অভিজ্ঞতাকে কৃষক নিছক বাজারি টানাপোড়েন হিসেবে দেখেন না; তাঁদের কাছে এটি বঞ্চনা ও বৈষম্যের প্রশ্ন।
রাতভর লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়া, আর একই সময়ে খোলাবাজারে বাড়তি দামে তা মেলা—এই বৈপরীত্য কৃষকের ধৈর্যের সীমা ভেঙে দিচ্ছে। গুদাম ভাঙার মতো ঘটনা তাই আইনি দৃষ্টিতে অনভিপ্রেত হলেও, এর পেছনের ক্ষোভ ও অবিশ্বাসকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।
এ পরিস্থিতি নতুন নয়। অতীতেও সার নিয়ে কৃষকের অসন্তোষ চরম রূপ নিয়েছে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও বছরের পর বছর একই ধরনের সংকট ফিরে আসাটাই বলে দেয়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো এখনো দূর হয়নি।
প্রশাসনিক তদারকিতে ঘাটতি থাকলে এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর পথ না থাকলে, কৃষকেরা বারবার এমন প্রত্যক্ষ প্রতিরোধের পথেই হাঁটবেন—এটাই স্বাভাবিক। শুধু আইনশৃঙ্খলার বুলি দিয়ে এই সংকট মেটানো যাবে না। বল প্রয়োগ কিংবা মামলা-জরিমানা দিয়ে ক্ষোভ সাময়িকভাবে থামানো গেলেও, এর মূল কারণ থেকে যাবে অমীমাংসিত।
প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কৃষকবান্ধব বণ্টনব্যবস্থা। এ লক্ষ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি বলে আমরা মনে করি—
ইউনিয়ন ও উপজেলাভিত্তিক সার বরাদ্দ, ডিলারের হাতে থাকা প্রকৃত মজুত এবং বিতরণের সময়সূচি নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, যাতে কৃষক নিজেই তথ্য যাচাই করতে পারেন।
স্থানীয় কৃষক প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে স্বচ্ছ তদারকি কমিটি গঠন করে বিতরণ প্রক্রিয়া তদারকি করতে হবে।
ডিলারদের ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব নিয়মিত নিরীক্ষা করে অনিয়ম পাওয়া গেলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
কৃষকদের জন্য সহজ, দ্রুত ও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে সংকট বিক্ষোভে রূপ নেওয়ার আগেই সমাধান হয়।
মুঠোফোন বার্তা বা ডিজিটাল তালিকার মাধ্যমে বরাদ্দ ও বিতরণের তথ্য সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির সুযোগ কমে।
কৃষক অনুদান চান না, চান ন্যায্যমূল্যে উৎপাদন-উপকরণ। এই মৌলিক দাবি পূরণে ব্যর্থ হলে কৃষি খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তার মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হবে গোটা জাতিকে।
সরকারকে তাই কেবল মজুতের পরিসংখ্যান দিয়ে আশ্বস্ত না থেকে, বণ্টনব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
কেকে/ এমএস