বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে নাকাল গ্রাহক, বিব্রত সরকার      জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির শপথ নিলেন খলিলুর রহমান      ‘আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে’—মন্তব্য ঘিরে আপিল বিভাগে যা ঘটল      ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেল ৯ জনের      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৯৯৯      প্রাথমিকের ১৪৩৮৪ সহকারী শিক্ষকের যোগদান ১ অক্টোবর      ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযান, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
আমদানি ব্যয় হাজার কোটি, দেশের কারখানা বন্ধ
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:১৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সার কিনতেই প্রতিবছর রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জাহাজভাড়া, সমুদ্র পরিবহন, বন্দরে খালাস, লাইটারেজ, বস্তাবন্দি এবং দেশের বিভিন্ন গুদামে পৌঁছে দেওয়ার ব্যয়। অথচ দেশে ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। 

সর্বশেষ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, কাফকোতে ফের উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যেই সৌদি আরব থেকে ৮০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির জন্য দুটি পৃথক সীমিত মালভাড়া দরপত্র আহ্বান করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)।

একদিকে বিদেশ থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সার কেনার প্রস্তুতি, অন্যদিকে সেই সার দেশে আনতে নতুন করে জাহাজভাড়া ও পরিবহন ব্যয়। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের ওপর বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা। বিএসসি গত ৭ সেপ্টেম্বর ৪০ হাজার টন করে দুই চালান বাল্ক দানাদার ইউরিয়া পরিবহনের জন্য আন্তর্জাতিক সীমিত মালভাড়া দরপত্র আহ্বান করেছে। উভয় চালানের উৎস সৌদি আরবের ইয়ানবু বাণিজ্যিক বন্দর। প্রথম চালানের লে-ইকেন ১৪ থেকে ১৮ অক্টোবর এবং দ্বিতীয় চালানের ২৬ থেকে ৩০ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে।

দুটি চালানে মোট ৮০ হাজার টন ইউরিয়া। তবে সার কেনার অর্থের বাইরে এই বিপুল পরিমাণ পণ্য দেশে আনতে মালভাড়া বাবদ রাষ্ট্রকে কত টাকা গুনতে হবে, দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে তার কোনো অঙ্ক উল্লেখ নেই। ফলে সামনে আসছে বড় প্রশ্ন, এক টন সার কৃষকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রকৃত সরকারি ব্যয় কত?

দরপত্রটি আবার ‘আন্তর্জাতিক সীমিত মালভাড়া দরপত্র’। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আইএমসিসি-তালিকাভুক্ত ব্রোকাররাই এতে অংশ নিতে পারবেন। ফলে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয়ের এই পরিবহন ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতার পরিধি কতটা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আমদানিতে ডলার, পরিবহনেও ডলার

দেশে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫৭ দশমিক ৭ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়ার অংশ প্রায় ৪৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি করা ইউরিয়ার প্রতি টনের ব্যয় ছিল ৫৬ হাজার ৫৪৭ টাকা। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৫১ হাজার ৪১৮ টাকা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজার ও ডলারের দরের চাপের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় আমদানিকৃত ইউরিয়ার প্রকৃত খরচ আরও বাড়ছে।

এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে জাহাজভাড়া, বন্দরে খালাস, লাইটারেজ, বস্তাবন্দি এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন। ফলে আমদানির ঘোষিত ক্রয়মূল্যই সারের প্রকৃত সরকারি ব্যয় নয়।  

২০২৪ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিসিআইসি-সংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাতে বলা হয়েছিল, আগের অর্থবছরে সার আমদানিতে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে সার আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বহুগুণ বেড়েছে। 

এদিকে ২০২৬ সালের আগস্টে সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয় ২১৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রতি টনের দাম প্রায় ৫৩ হাজার ২৫০ টাকা। এর সঙ্গে এখন যোগ হবে ইয়ানবু থেকে বাংলাদেশে আনার মালভাড়া এবং বন্দরের খালাস, লাইটারেজ ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয়। অর্থাৎ সার কেনার পরও রাষ্ট্রের খরচ শেষ হচ্ছে না, বরং শুরু হচ্ছে আরেক দফা ব্যয়। 

উৎপাদন সক্ষমতা সত্ত্বেও বিদেশমুখী

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে দেশে ইউরিয়া উৎপাদনের ক্ষেত্রেই। পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া গেলে স্থানীয়ভাবে ইউরিয়া উৎপাদনের খরচ আমদানির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য রয়েছে।

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা ইউরিয়ার প্রতি টনের ব্যয় ছিল ৫৬ হাজার ৫৪৭ টাকা। বিপরীতে পর্যাপ্ত গ্যাসে স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৩৮ হাজার টাকা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে প্রতি টনে উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে দেশের সার কারখানাগুলো নিয়মিত উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না। ফল হচ্ছে, কারখানা বন্ধ, উৎপাদন কম এবং সেই ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে সার আমদানি।

২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার প্রয়োজন ছিল দৈনিক প্রায় ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছিল মাত্র ১০৭ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে চারটি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এবারও সেই বাস্তবতার নতুন চিত্র দেখা গেল চট্টগ্রামের আনোয়ারায়।

চার মাস পরই কাফকো বন্ধ

গত ৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা থেকে কাফকোতে ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। একইসঙ্গে কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহও ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এতদিন কাফকোতে দৈনিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। সোমবার বেলা ১১টা থেকে তা কমিয়ে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে।

কেজিডিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ চালু করা হবে।

তবে কাফকো কর্তৃপক্ষের দাবি, উৎপাদন বন্ধের কারণ রক্ষণাবেক্ষণ। কারখানাটির চিফ অব পার্সোনেল ফারুক আহমেদ জানান, ‘তিন বছর পরপর কাফকো কারখানা মেইনটেনেন্স করতে হয়। এ কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। মেইনটেনেন্সের জন্য এক থেকে দেড় মাস কারখানা বন্ধ রাখা হয়। মেইনটেনেন্স শেষে পুনরায় চালু করা হবে।’ 

এর আগে দুই মাস বন্ধ থাকার পর গত ১ মে কাফকোতে উৎপাদন শুরু হয়েছিল। মাত্র চার মাস পরই আবার উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানি ব্যবস্থাপনার সমন্বয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ভর্তুকির পরও বাড়ছে বোঝা

সারের দাম কৃষকের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ছিল। আন্তর্জাতিক সারমূল্য, ডলারের দর এবং শিপিং ব্যয় বাড়ার কারণে এ ব্যয় আরও বাড়ার চাপ তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমে বৈদেশিক মুদ্রায় সার কেনা, এরপর জাহাজভাড়া দিয়ে দেশে আনা, বন্দরে খালাস ও লাইটারেজ, পরে অভ্যন্তরীণ পরিবহন এবং সবশেষে কৃষকের জন্য ভর্তুকি। এ ব্যয়ের প্রতিটি স্তরেই সামান্য অদক্ষতা বড় অঙ্কের সরকারি ক্ষতিতে পরিণত হতে পারে। 

শুধু সর্বম্নি দর নয়, দেখতে হবে মোট ব্যয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি চালানের ক্ষেত্রে শুধু সর্বনিম্ন মালভাড়া পেলেই রাষ্ট্রের প্রকৃত সাশ্রয় নিশ্চিত হয় না। জাহাজের ধারণক্ষমতা, বন্দরে অবস্থানকাল, লাইটারেজ, খালাস, বস্তাবন্দি এবং গুদামে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ব্যয় হিসাব করতে হবে।

বিশেষ করে ৪০ হাজার বা ৮০ হাজার টনের বড় চালানে প্রতি টনে সামান্য অতিরিক্ত ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। এ কারণে সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া আমদানির পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে সার আমদানির প্রতিটি চালানের ক্রয়মূল্য, জাহাজ ভাড়া, বন্দরের খরচ, লাইটারেজ, অভ্যন্তরীণ পরিবহন এবং ভর্তুকির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি জোরালো হচ্ছে। 

কারণ সার আমদানির ব্যয় শুধু একটি পণ্যের ক্রয়মূল্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈদেশিক মুদ্রা, জাহাজভাড়া, বন্দর ব্যবস্থাপনা, পরিবহন এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি। 

অন্যদিকে দেশে ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার পরও যদি গ্যাস সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবস্থাপনার কারণে কারখানা বন্ধ থাকে এবং সেই ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে সার আনতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতির দায় আরও গভীর হয়। 

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  আমদানি ব্যয়   কারখানা বন্ধ   সার সংকট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close