দিনে দিনে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৯ জন মারা গেছেন। যা চলতি বছর একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। বিষয়টি স্বাস্থ্যখাতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে তৃণমূল পর্যায়ে এ রোগ নির্মূলের পরামর্শ দিচ্ছেন বিষেশজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে ১৩০ জন মারা গেছেন। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন ডেঙ্গুরোগী।
তথ্য বলছে, সদ্যসমাপ্ত আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২০ হাজার ৫৩৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। যা এর আগের জুলাই মাসের (৯২০৬) দ্বিগুণেরও বেশি। এদিকে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ৭ দিনেই ৯ হাজার ৬২৯ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যা এরই মধ্যে জুলাই মাসের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে মৃত্যুর সংখ্যায় চলতি মাস ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৩৩ জন। অথচ আগস্টে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু ছিল ৪৩ জন। জুলাইতে মারা গেছেন ৩৬ জন।
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অন্তত ১০ শতাংশ শয্যা সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এ নির্দেশনা নিশ্চিত করেছেন। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীদের মাধ্যমে যেন নতুন করে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য প্রতিটি শয্যায় মশারি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশের সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ যেন কোনো ধরনের আর্থিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন, সেজন্যই সরকার এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর কারণে স্বাস্থ্যখাতে বিপর্যয়ের শঙ্কা আছে। এ রোগ প্রতিরোধে আমাদের ফ্রি টেস্ট ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মূলত, গরিব রোগীদের বিষয়ে বেশি জোর দিতে হবে। রোগ নির্ণয়ে ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি ল্যাব চালু করতে হবে। সরকারকে যেখানে প্রয়োজন সেখানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষ করে গ্রাম, উপজেলা ও জেলাগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তখন খুব কম রোগী ঢাকা বা বড় বড় শহরের হাসপাতালে ভিড় করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না করা গেলে, শেষ পর্যায়ে গুরুত্ব দিলে কাজ হবে না। এখন বড় বড় হাসপাতালে এমনিতেই অনেক ভিড়, গ্রাম বা উপজেলা থেকে আরও রোগী গেলে স্বাস্থ্যখাতে বিপর্যয়ের শঙ্কা আছে।
এদিকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যেই সারা দেশের সিভিল সার্জনদের হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি জোরদার করা এবং সচেতনতা বাড়ানোর কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং এর বিস্তার রুখতে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক অভিযান শুরু করার ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে এ মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। তাই জ্বর হলেই অবহেলা না করে অবিলম্বে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তরল খাবার ও স্যালাইন নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, এডিস মশা একজনকে কামড় দেয়, তাহলে ১০০ জনের দেহে ডেঙ্গুর জীবাণু ঢুকবে। তবে মাত্র ২০ জনের দেহে এর লক্ষণ ফুটে উঠবে, বাকি ৮০ জনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা যাবে না। তাদের আমরা বলি লক্ষণবিহীন বা অ্যাসিম্পটোমেটিক ডেঙ্গু রোগী। আবার লক্ষণধারী ২০ জনের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের দেহে ডেঙ্গুর মৃদু লক্ষণ থাকে। তাই তারা চিকিৎসকের কাছে যায় না। গেলেও প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেয়েই ভালো হয়ে যায়। বাকি যে ৮-১০ জনের মধ্যে লক্ষণ দেখা যায়, তারাই শুধু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। হাসপাতালে যায় কিন্তু তিন-চারজন। এ তিন-চারজনকে দেখেই আমরা বাকি ৯৬-৯৭ জনের কথা ভুলে যাই। অথচ হাসপাতালে ভর্তি রোগীর এ সংখ্যা হলো ‘টপ অব দ্য আইসবার্গ’। এ কারণে ডেঙ্গুতে রোগী মৃত্যুর সংখ্যা বেশি।
তিনি আরও বলেন, আমরা বলেছি, জাতীয়ভাবে তিন দিন উদ্যোগ নিলেই এডিস মশার বেশিরভাগ উৎস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। আমরা জানি, এডিস মশা তিন দিনের জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে এবং সে ডিম থেকে বাচ্চা হয়। তাহলে টানা তিন দিন যদি ঘরে-বাইরে দুই ধরনের মশা নিধনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংঠনের কর্মীদের যুক্ত করে অভিযান চালানো যায়, ডেঙ্গু মোকাবিলা কঠিন নয়। ম্যালেরিয়ার জন্য জাতীয় পরিকল্পনা হয়েছিল, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে যা এখনো দৃশ্যমান নয়।
কেকে/ এমএস