বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে কাঁপছে হাওরের জল। ঢোলের তালে মাঝিদের হুঙ্কার—‘জোরে, জোরে!’ মুহূর্তেই পানির বুক চিরে ছুটে চলছে একের পর এক নৌকা। কখনো একটি নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে, আবার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বৈঠার দুর্দান্ত টানে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকাটি উঠে আসছে সামনে। দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাস-করতালিতে উত্তাল হয়ে উঠছে পুরো হাওর।
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চইল্লাতি হাওরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। নিকলী নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতাকে ঘিরে হাওরপাড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মো. সাদ্দাম হোসেন সাদু। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নিকলী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মো. শরিফুল হক। নৌকাবাইচের উদ্বোধন করেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু, সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. কফিল উদ্দিন আহমেদ, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল-২-এর পিপি অ্যাডভোকেট এ এম সাজ্জাদুল হক, উপজেলা বিএনপির ১ নম্বর সহসভাপতি আবু সাঈদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
প্রতিযোগিতায় ছোট-বড় মিলিয়ে অংশ নেয় ১০টি নৌকা। তিন পর্বে চলে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রতিটি পর্বেই ছিল উত্তেজনা ও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের অনিশ্চয়তা। মাঝিদের সমন্বিত বৈঠার টানে মুহূর্তেই গতি বাড়িয়ে ছুটে চলে নৌকাগুলো। আর নৌকা যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে দর্শকদের উল্লাস।
বড় নৌকার প্রতিযোগিতায় শুরু থেকেই দুর্দান্ত গতি ধরে রাখেন নিকলী সদর ইউনিয়নের ইসরাফিল মাঝি। শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। বিজয়ী হিসেবে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি ফ্রিজ। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন সিংপুরের ইটকলা সর্দার গ্রুপের মজিবুল্লাহ। তার দলকে দেওয়া হয় ৩২ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন।
ছোট নৌকার প্রতিযোগিতাতেও ছিল সমান উত্তেজনা। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর প্রথম স্থান অর্জন করে পাচলীপাড়া দল। বিজয়ী দল পায় ২৪ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন। দ্বিতীয় হয় নিকলীর গোবিন্দপুরের মোবারক দল। তাদের দেওয়া হয় একটি মোবাইলফোন।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই হাওরের দুই পাড়ে ভিড় করতে থাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিযোগিতা শুরুর পর দর্শনার্থীদের উপস্থিতি আরও বেড়ে যায়। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্করাও উপভোগ করেন গ্রামবাংলার এ ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।
নৌকা ছুটে চলার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের করতালি, উল্লাস আর মাঝিদের হুঙ্কারে মুখর হয়ে ওঠে চইল্লাতি হাওর। অনেকের কাছে এ আয়োজন ছিল শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার উপলক্ষ। আবার নতুন প্রজন্মের কাছে এটি হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।
আয়োজকেরা জানান, নৌকাবাইচ শুধু জয়-পরাজয়ের প্রতিযোগিতা নয়; এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি আয়োজন। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনে নৌকা যেমন যাতায়াত ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম, তেমনি নৌকাবাইচ তাদের আনন্দ, আবেগ ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হারিয়ে যেতে বসা এ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির শেকড়কে আরও শক্তভাবে ধরে রাখতেই এ আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান আয়োজকেরা।
কেকে/সাশ