সকালের নরম আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথে কেবল শুরু হয়েছে মানুষের চলাচল। কেউ যাচ্ছেন কর্মস্থলে, কেউ বাজারে, আবার কেউ বের হয়েছেন প্রয়োজনীয় কাজে। এরই মধ্যে স্কুটি নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়েন টিপু সুলতান। তবে তার স্কুটিতে থাকে না শুধু ব্যবসার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সঙ্গে থাকে দা, হ্যান্ডগ্লাভস ও একজোড়া গামবুট।
পথে চলতে গিয়ে কোথাও রাস্তার ওপর নুয়ে পড়া গাছের ডাল, কোথাও লতাপাতা-আগাছায় সংকুচিত হয়ে আসা চলাচলের জায়গা কিংবা ঘন ঝোপঝাড় চোখে পড়লেই থেমে যান তিনি। স্কুটি এক পাশে রেখে হাতে তুলে নেন দা। শুরু করেন আগাছা কাটা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার কিংবা রাস্তার ওপর ঝুলে থাকা ডালপালা ছাঁটার কাজ।
কেউ তাঁকে এ দায়িত্ব দেয়নি। নেই কোনো পারিশ্রমিকও। তারপরও নিজের সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে মানুষের চলাচলের পথ নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন টিপু। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার সহস্রাম ধুলদিয়া ইউনিয়নের পারদিয়াকুল গ্রামের এ বাসিন্দার এমন উদ্যোগে প্রশংসা করছেন স্থানীয়রা।
টিপু সুলতানের গ্রামের পাশের বাজারে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে সময় বের করে নেন তিনি। কখনো দোকানের কাজ শেষে, আবার কখনো ভোরে ফজরের নামাজের পর স্কুটি নিয়ে বের হন। স্কুটির সঙ্গে থাকে দা, হ্যান্ডগ্লাভস ও গানবুট।
গ্রামের অনেক রাস্তা আঁকাবাঁকা। রাস্তার দুই পাশে গাছপালা ও ঝোপঝাড় বেড়ে ওঠায় কোথাও কোথাও কমে যায় দৃষ্টিসীমা। বিশেষ করে রাস্তার বাঁকে নুয়ে পড়া ডালপালা ও ঘন আগাছার কারণে সামনে থেকে আসা যানবাহন সহজে দেখা যায় না। এতে বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এমন দৃশ্য চোখে পড়লেই থেমে যান টিপু। দা দিয়ে কেটে ফেলেন আগাছা ও ঝোপঝাড়। প্রয়োজন হলে ছেঁটে দেন রাস্তার ওপর নুয়ে পড়া ডালপালা। মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে—এমন যেকোনো বিষয় নজরে এলে নিজের মতো করে তা সমাধানের চেষ্টা করেন তিনি।
টিপুর স্বেচ্ছাসেবী কাজেরও নেই নির্দিষ্ট কোনো সময়। গত কয়েক দিনে তিনি প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার করেছেন বলে জানান। তার লক্ষ্য, পর্যায়ক্রমে ইউনিয়নের বিভিন্ন রাস্তা থেকে মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা আগাছা, ঝোপঝাড় ও ঝুঁকিপূর্ণ ডালপালা সরিয়ে দেওয়া।
শুধু রাস্তা নয়, নিজের গ্রামের একটি কবরস্থানও পরিষ্কার করেছেন টিপু। পারদিয়াকুল গ্রামের ওই কবরস্থানটি একসময় আগাছা ও ঝোপঝাড়ে অনেকটাই ঢেকে গিয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে জমেছিল ময়লা-আবর্জনা। কোথাও কোথাও হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে কারও নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজেই কাজে নেমে পড়েন টিপু। গানবুট পায়ে, হাতে গ্লাভস ও দা নিয়ে কবরস্থানে ঢুকে একের পর এক আগাছা ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেন। কবরের আশপাশে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনাও সরিয়ে দেন।
টিপুর কাছে এটি শুধু পরিচ্ছন্নতার কাজ নয়; মৃতদের প্রতি সম্মান জানানোরও মাধ্যম।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তার উদ্যোগে কবরস্থানটি আগের তুলনায় অনেক পরিচ্ছন্ন হয়েছে। ফলে স্বজনরা কবর জিয়ারতে এসে এখন স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারছেন।
স্থানীয় পথচারী ইমরান বলেন, ‘রাস্তা আগে অপরিচ্ছন্ন ছিল। আগাছা ও গাছপালার কারণে সামনে ঠিকমতো দেখা যেত না। এতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ছিল। টিপু রাস্তা পরিষ্কার করায় এখন রাস্তা অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে। মানুষের চলাচলেও সুবিধা হচ্ছে।’
কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘পারদিয়াকুল গ্রামের একটা জায়গা আগে জঙ্গলের মতো হয়ে গিয়েছিল। টিপু নিজে সেটি পরিষ্কার করেছে। এখন জায়গাটা অনেক সুন্দর হয়েছে। মানুষও খুশি।’
স্থানীয় বাসিন্দা জালাল উদ্দীন বলেন, ‘এ রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় গাছের ডালপালা শরীরে লেগে যেত। সামনে কী আছে, সেটাও ঠিকমতো দেখা যেত না। টিপু পরিষ্কার করার পর এখন রাস্তায় চলাচল করতে অনেক সুবিধা হয়। গাড়ির সঙ্গেও ডালপালার ধাক্কা লাগে না।’
স্বেচ্ছাসেবী টিপু সুলতান বলেন, ‘রাস্তায় নুয়ে পড়া গাছের ডালপালার কারণে অনেক সময় বাঁকগুলোতে সামনে থেকে আসা যানবাহন দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। তাই মানুষের চলাচল নিরাপদ ও সহজ করতে নিজের উদ্যোগে কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসার পাশাপাশি অতিরিক্ত সময় দিয়ে ফজরের নামাজের পর বিভিন্ন রাস্তার আগাছা ও গাছপালা পরিষ্কার করি। গত কয়েক দিনে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার করেছি। ইনশাআল্লাহ পর্যায়ক্রমে পুরো ইউনিয়নের রাস্তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করব। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ—এ বিশ্বাস থেকেই কাজটি করছি।’
কেকে/এআই