সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে চালু করা ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচির খাবার নিয়ে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা বনরুটিতে সুই ও ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়নের কেজুরি ছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বনরুটির ভেতর দুইটি লম্বা সুই পাওয়ার অভিযোগ করেছে। এর দুই দিন আগে একই ইউনিয়নের টিপড়াছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বনরুটিতে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ তোলে।
শিশুদের খাবারে এ ধরনের বস্তু পাওয়ার অভিযোগে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসূচির খাবার রুটিন অনুযায়ী সরবরাহ না করা, কোনো কোনো দিন নির্দিষ্ট আইটেম না দেওয়া, ভাঙা ডিম ও কাঁচা কলা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত এ কর্মসূচি শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া উপজেলায় বাস্তবাযিত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে কর্মসূচিটি বাস্তায়ন করছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও পৌরসভার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। কর্মসূচির আওতায় সপ্তাহে পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের বনরুটি, সেদ্ধ ডিম, দুধ, বিস্কুট ও কলাসহ পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার কথা।
তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে খাবার সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়নের কেজুরি ছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রীতি শুক্ল বৈদ্য স্কুল থেকে পাওয়া বনরুটি বাড়িতে নিয়ে যায়। ছোট বোনের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার জন্য প্যাকেটটি খোলার পর রুটির মাঝ বরাবর দুইটি লম্বা সুই দেখতে পাওয়ার অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
প্রীতির বাবা কার্তিক বৈদ্য জানান, কয়েকদিন আগে পাশের টিপড়াছড়া বিদ্যালয়ে বনরুটিতে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগের ঘটনা জানার পর তিনি সন্তানদের রুটি পরীক্ষা করে খেতে বলেছিলেন। ওই দিন মেয়ে বনরুটি নিয়ে বাড়িতে এলে তিনি নিজেই প্যাকেট খুলে রুটির ভেতরে ন গেঁথে থাকা একটি পুরোনো ও একটি কিছুটা নতুন সুই দেখতে পান। কার্তিক বৈদ্য বলেন, আমি প্যাকেটটি না খুলে আমার মেয়ে নিজে খুললে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। শিশুদের খাবারে এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
পরিবারের দাবি, ঘটনাটি দেখতে পেয়ে তারা স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য বৈশিষ্ট গোয়ালা ও প্রতিবেশীদের জানান। পরে ওয়ার্ড সদস্যসহ স্থানীয় কয়েকজন ওই বনরুটি বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করেন।
চা-শ্রমিক রবি বোনার্জি বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং প্যাকেট খোলার পর রুটির মধ্যে দুইটি সুই দেখতে পান। পরে তারা বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে জানান।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিক্ষার্থীর মা শোভা শুক্ল বৈদ্য বলেন, ‘শিশুদের খাবারে মরণঘাতী সুই পাওয়ার পর আমরা খুবই শঙ্কিত। আমার মেয়ে না দেখে সেটি খেয়ে ফেললে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। যারা শিশুদের খাবারে এমন মরণঘাতী বস্তু দিয়ে ক্ষতি করতে চায়, আমরা তাদের উপযুক্ত বিচার চাই।’
রাজঘাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বৈশিষ্ট গোয়ালা বলেন, ‘শিশুদের খাবারে এসব মরণঘাতী উপাদান পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিষয়টি স্কুলে গিয়ে জানিয়েছি এবং বিদ্যালয়ের স্যার ও মেডামদের বলেছি এ বিষয়টি ইউএনও স্যারকে জানানোর জন্য, যেনো তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।’
কেজুরি ছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুরেন্দ্র তাঁতী বলেন, ‘বৃহস্পতিবার এক অভিভাবক ও স্থানীয় ইউপি সদস্য বনরুটিটি বিদ্যালয়ে এনে দেখান। রুটির মাঝ বরাবর দুইটি সুই ছিল বলে তিনি জানান। পরে বিষয়টি প্রধান শিক্ষকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমা রানী দেব বলেন, ‘আমি ছুটিতে রয়েছি। তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি।’
এর আগে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) একই ইউনিয়নের টিপড়াছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বনরুটির ভেতর ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ তুলেছিল তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইমন।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুধন বুনার্জি বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
তবে খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্সের প্রতিনিধিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি আহমেদ বাবু বলেন, ‘কেজুরি ছড়া বিদ্যালয়ে বনরুটির অভিযোগের বিষয়ে এখনো কেউ আমাদের জানায়নি। টিপড়াছড়া বিদ্যালয়ে বনরুটিতে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগটি আমরা তদন্ত করে কোনো সত্যতা পাইনি।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কেজুরি ছড়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুই পাওয়ার বিষয়টি আজ আমাকে জানিয়েছেন। ঘটনাটি ইউএনও মহোদয় ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়েছে এবং লিখিতভাবে প্রকল্পে অবহিত করা হবে। আর টিপড়া ছড়া বিদ্যালয়ে ব্লেড পাওয়ার বিষয়ে আমরা তদন্ত করছি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, মেশিনে প্রস্তুত করায় বনরুটিতে এমন কিছু থাকা সম্ভব নয়।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি আপনার মাধ্যমে জেনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এমএ