চট্টগ্রামে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম কীভাবে এখনো আতঙ্কের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা। হাটহাজারী, বায়েজিদ বোস্তামী ও খুলশী এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ যে চক্রটি ধরেছে, তারা পরিচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে চিকিৎসক ও ব্যবসায়ীদের কাছে লাখ লাখ টাকা দাবি করেছিল। টাকা না দিলে দেওয়া হতো প্রাণনাশের হুমকি।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই চাঁদাবাজির পেছনে যেসব নাম ব্যবহার করা হয়, তাদের অনেকেই কারাগারে বন্দি কিংবা দেশত্যাগ করে বিদেশে অবস্থান করছেন। তবু তাদের নাম এতটাই ভীতিজনক যে, স্রেফ নাম শুনিয়েই সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা সম্ভব হচ্ছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাহীনতার সীমাবদ্ধতাও অপরাধীরা কাজে লাগাচ্ছে। একজন সন্ত্রাসী কারাগারে থাকলেও তার নাম, পরিচিতি ও পূর্বের কুখ্যাতি বাজারে সক্রিয় মুদ্রার মতো ব্যবহৃত হতে থাকে।
বিদেশি নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচয় আড়াল করাও চক্রগুলোর জন্য সহজ হয়ে উঠেছে। পুলিশ সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কারও কারও বিরুদ্ধে আগে থেকেই অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার একাধিক মামলা রয়েছে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—পূর্বেও মামলার মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিরা কীভাবে বারবার নতুন করে চাঁদাবাজির চক্র গড়ে তুলতে পারছেন?
এর একটি বড় কারণ বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষী-ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তাহীনতা। ভুক্তভোগীরা প্রায়ই মামলা করতে ভয় পান। কারণ, চাঁদা আদায়কারী গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতা অধরা থেকে যায় এবং প্রতিশোধের আশঙ্কা থেকেই যায়।
চাঁদাবাজি নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতির ওপরও প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীরা যখন নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য হন, তখন সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামেই যুক্ত হয়ে ভোক্তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ে। বিনিয়োগ-পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ কোনো উদ্যোক্তাই এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ বোধ করেন না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে অবিলম্বে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। কারাবন্দি বা পলাতক সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত চাঁদাবাজি চক্র শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ভয় ছাড়াই অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
পূর্বে একাধিক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও জামিনে মুক্ত থাকা ব্যক্তিদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। কারাগারের ভেতর থেকে মোবাইল ফোন বা যোগাযোগ-যন্ত্র ব্যবহার বন্ধে কারা কর্তৃপক্ষের নজরদারি জোরদার করতে হবে। চাঁদাবাজি-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা অগ্রাধিকারভিত্তিক শুনানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
চট্টগ্রাম পুলিশের এই অভিযান প্রশংসনীয়। কিন্তু এটি সমস্যার সমাধান নয়, কেবল একটি লক্ষণের প্রতিরোধ। যত দিন পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের নামের ভীতি একটি ব্যবসায়িক পুঁজি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য থেকে যাবে, তত দিন এমন চক্র নতুন রূপে ফিরে আসতেই থাকবে।
সরকারকে তাই কেবল ব্যক্তি-অপরাধীর পেছনে না ছুটে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে—এটিই এখন সময়ের দাবি।
কেকে/এমএস