মানুষ ও প্রাকৃতিক জলাভূমির অনন্য মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছিল এই পলিগঠিত সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নদী, নালা, খাল ও বিল কেবল প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা, কৃষিব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, অভ্যন্তরীণ জলপথের উন্নয়ন ও সামগ্রিক জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে মানবদেহের রক্তবাহী ধমনির মতো ভূমিকা পালন করে এসেছে।
কিন্তু আধুনিক নগরায়ণের অদূরদর্শী গতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং একশ্রেণির চরম স্বার্থান্বেষী মানুষের লোভে আজ সেই প্রবহমান খালগুলো গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ইট-কংক্রিটের এই কৃত্রিম নগরে একসময়ের খরস্রোতা খালগুলো এখন শুধুই সরকারি নথিপত্রের আঁকিবুঁকি, আর বাস্তবে ময়লা-আবর্জনার পচা নর্দমা অথবা বহুতল ভবনের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া মৃত স্মৃতি। নগরজীবনের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে করে তুলছে বিষাদময় এবং পুরো পরিবেশকে ঠেলে দিচ্ছে এক অপূরণীয় বিপর্যয়ের দিকে।
একটি টেকসই নগর বা গ্রামীণ জনপদের সুস্থ পরিবেশের জন্য উন্মুক্ত জলাশয় ও প্রবহমান খালের ভূমিকা অপরিসীম। খাল মূলত নদী থেকে নদীতে কিংবা জলাভূমির সঙ্গে নদ-নদীর সংযোগ রক্ষা করে একটি প্রাকৃতিক ও স্বয়ংক্রিয় পরিবেশগত ভারসাম্য গড়ে তোলে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে তা দ্রুত শুষে নেওয়া কিংবা নদীর দিকে প্রবাহিত করে শহরকে ভয়াবহ জলজট থেকে রক্ষা করতে খালগুলো বিশাল স্পঞ্জের মতো কাজ করে। এটি কেবল পানি নিষ্কাশনই করে না, বরং বাতাসের আর্দ্রতা ধরে রেখে চড়া রোদের দিনে শহরের সামগ্রিক তাপমাত্রা সহনীয় রাখতেও সাহায্য করে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের প্রতিটি প্রান্তেই আজ খাল দখলের মহোৎসব চলছে। প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলদারিত্ব, আবাসন প্রকল্পের নামে যত্রতত্র বালু ভরাট, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যের স্তূপ তৈরি এবং অপ্রয়োজনীয় রাস্তা নির্মাণের অজুহাতে একে একে গিলে খাওয়া হচ্ছে এই প্রবহমান জলধারাগুলোকে। ড্রেজারের বিকট শব্দ আর কংক্রিটের অট্টালিকার ওজনের নিচে প্রতিদিন নিঃশব্দে চাপা পড়ছে একেকটি খালের দীর্ঘশ্বাস।
পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি খাল শুধু পানি বহনের নালা নয়; এটি সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। একটি জীবন্ত খালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ছোট-বড় মাছ, উভচর প্রাণী ও পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। খাল যখন ভরাট হয়ে যায়, তখন সেই পুরো বাস্তুতন্ত্র একলহমায় ধ্বংস হয়ে যায়। জলজ প্রাণীগুলোর স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে পড়ে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষা এবং প্রোটিনের জোগানের ওপর।
এর পাশাপাশি, প্রবাহহীন জমে থাকা পানি কিংবা ময়লার স্তূপে রূপ নেওয়া খালগুলো হয়ে ওঠে মশা-মাছিসহ নানাবিধ রোগজীবাণুর অভয়ারণ্য। ফলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ পানিবাহিত প্রাণঘাতী রোগের সংক্রমণ বছরের পর বছর ধরে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। অর্থাৎ, একটি খালকে ভরাট করা বা মেরে ফেলার অর্থ হলো পরোক্ষভাবে পুরো জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
নগরায়ণ কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চয়ই আধুনিক সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি হয় প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে, তবে তা কখনোই কল্যাণকর বা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে না। বিশ্বায়নের এই যুগে উন্নত ও সুপরিকল্পিত নগরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা নদীর পাশাপাশি খাল ও জলাশয়গুলোকে শহরের মূল সৌন্দর্যের প্রাণকেন্দ্র বানিয়ে তুলেছে। ব্যাংকক, আমস্টারডাম কিংবা ভেনিসের মতো শহরগুলো তাদের খালগুলোকে সংরক্ষণ করে পর্যটন, অভ্যন্তরীণ বিনোদন ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগের চমৎকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, খালের বহমানতা বজায় রাখা শহরের স্বাস্থ্য রক্ষার সমার্থক।
অথচ আমরা ঠিক উল্টো পথে হেঁটে খাল ভরাট করে ময়লা ফেলার ভাগাড়ে পরিণত করছি অথবা তার ওপর ঢালাই করে রাস্তা বানাচ্ছি, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল সংকট তৈরি করছে।
খালগুলোকে পূর্বের সচল রূপ ও প্রাণশক্তিতে ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে কেবল মুখে প্রতিশ্রুতির বাণী কিংবা লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করলেই চলবে না। প্রায়ই দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযানে কিছু অস্থায়ী দখলকৃত অংশ ভাঙা হলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। এই আইনি শিথিলতা ও তদারকির অভাব বন্ধ করতে প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার বিভাগকে এক হয়ে খালের মূল সীমানা চিহ্নিত করতে হবে। সিএস, আরএস ও বিএস রেকর্ড অনুযায়ী খালের জমি উদ্ধার করতে হবে এবং খালের জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা, তা যতই প্রভাবশালী ব্যক্তির হোক না কেন, তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। অবৈধ দখলদারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কেউ জলাধার ভরাটের মতো পরিবেশবিরোধী অপরাধ করার দুঃসাহস না পায়।
প্রকৃতির নিয়মকে অস্বীকার করে মানুষ কখনোই স্থায়ীভাবে বিজয়ী হতে পারেনি। প্রাকৃতিক জলাধারগুলোকে তাদের আপন গতিতে বইতে দেওয়া এবং তাদের স্বাভাবিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই আমাদের পরিবেশবান্ধব বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। অবহেলিত ও মৃতপ্রায় খালগুলোতে যদি আবার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে আমাদের শহরগুলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে, সবুজ পরিবেশ সুরক্ষিত হবে এবং জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও রক্ষা পাবে দেশ।
এখন সময় এসেছে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ রেখে যেতে পারি।
প্রকৃতির প্রতি অবহেলা করে কোনো উন্নয়নই যে স্থায়ী হতে পারে না, খাল ভরাটের করুণ পরিণতি আজ আমাদের সেই শিক্ষাই দিচ্ছে। এখন সময় এসেছে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার। প্রশাসনিক কঠোরতা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে দখলদারদের হাত থেকে খালগুলোকে রক্ষা করতে হবে, খনন করে ফিরিয়ে দিতে হবে তাদের স্বাভাবিক নাব্য। মৃতপ্রায় খালগুলোতে যদি আবার স্বচ্ছ পানির প্রবহমান ধারা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবেই বেঁচে উঠবে আমাদের পরিবেশ, সুসংহত হবে জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে এক বাসযোগ্য, সবুজ ও নিরাপদ নগরী।
লেখক: সাংবাদিক
কেকে/এমএস