শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: লালবাগে পাঁচতলা ভবনের নিচে মাটি খুঁড়ে মিলল ব্যবসায়ীর লাশ      কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট আবার খুলে দেওয়া হলো      চার ক্যাচের খেসারত, ভারতের কাছে হেরে ফাইনালের স্বপ্নভঙ্গ বাংলাদেশের      বিএনপির হাতে শুরু বিএনপিতেই বিলুপ্তি      লংমার্চে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হলে আমরাই আগে করতাম : প্রধানমন্ত্রী      হাম ও ডেঙ্গুতে একদিনে ১৩ জনের মৃত্যু      ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৪৯২      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
গণআকাঙ্ক্ষা ও গণতন্ত্র এবং সার্বভৌমত্বে বিএনপি
মোহাম্মদ শাহজাহান (সম্রাট)
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫২ এএম আপডেট: ১১.০৯.২০২৬ ১১:৫৭ এএম

চলতি মাসের পহেলা তারিখ, অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির বয়স যখন অর্ধশত বছর হতে মাত্র দুই বছর দূরে, তখন দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। পাঠকদের কাছে ব্যাপারটি খানিকটা সরলীকরণ মনে হলেও দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের গণতন্ত্রহীনতা ও ফ্যাসিবাদী শাসন মোকাবিলা করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-২৪ পরবর্তী ঐতিহাসিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া ইতিহাসের কোনো সরল পাঠ নয়।

প্রথমেই বিএনপির সব স্তরের নেতাকর্মীদের আমি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাতে চাই। কারণ তারাই শত জুলুমের শিকার হয়েও এই দলটিকে টিকিয়ে রেখেছেন এবং সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে দলের রাজনীতিকে জনতার কাছে প্রাসঙ্গিক রেখেছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির সবচেয়ে বড় অবদানটি হলো, আওয়ামী লীগের বর্ণবাদী ও সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক মতাদর্শ বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে বাংলাদেশকে গণমানুষের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার রাজনৈতিক আদর্শ ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ হাজির করা। ফলে বাংলাদেশ একটি আধুনিক নাগরিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার গতিপথ পায়।

বিএনপির দীর্ঘ প্রায় অর্ধশত বছরের রাজনৈতিক যাত্রাপথ (Political Trajectory) বিশ্লেষণ করাই মূলত আমার আজকের লেখার মূল উপজীব্য।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস গণআকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রক্ষমতা, গণতন্ত্র ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের পারস্পরিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। এক্ষেত্রে সংবিধান মেনে রাজনীতি করা দলগুলো সবসময় নিজেদের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার বাহক, কখনো জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রহরী হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিক ন্যায্যতা কেবল তার ঘোষিত আদর্শ দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে প্রতিষ্ঠাকালীন তার বক্তব্য ও পরবর্তীতে তার কার্যকলাপ। কোন পরিস্থিতিতে দলটি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোথায় জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তার অবস্থান মিলেছে এবং কোথায় তার রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—সেসবও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিএনপিই একমাত্র দল, যে তার রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে স্থান দিয়েছে ও অনুশীলন করেছে। যার পুরস্কারস্বরূপ স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সব সফল গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের জনগণ বিএনপিকেই দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিষ্ঠা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের ঘটনা। স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসনব্যবস্থার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রীয় সংকটের প্রেক্ষাপটে দলটির আবির্ভাব ঘটে।

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রীয় সারকথা ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। ঘোষিত দলীয় কর্মসূচিতে জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রক্ষমতায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মূলত এখানেই বিএনপির রাজনীতির মৌলিকত্ব ফুটে ওঠে।

বিএনপির জন্মকে আরও ভালোভাবে বুঝতে হলে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগের বাংলাদেশকে বোঝা বেশি জরুরি। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক সংঘাত এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার পাশাপাশি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ১৯৭৫ সালের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা ও তৎপরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থিতিশীল করে ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্ম এবং জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও নির্বাচনি রাজনীতির একটি নতুন পর্বে বাংলাদেশ প্রবেশ করে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চায় এটি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত। স্বাধীন ঐতিহাসিক বিবরণেও দেখা যায়, জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পটভূমির মানুষকে বিএনপিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং ডান, বাম ও মধ্যপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রবাহ থেকে নেতাকর্মী গ্রহণ করেছিলেন। বিএনপি নিজেকে কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক ধারার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে একটি বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলে জাতীয় সংহতিকে মজবুত ভিত্তি দিয়েছিল। তাত্ত্বিকদের মতামত হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো বহুমাত্রিক সমাজে এই ধরনের রাজনৈতিক জোট ও সমন্বয়ের ধারণা দেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করেছিল।

১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপির উল্লেখযোগ্য বিজয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন দলটির রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে ত্বরান্বিত করে। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো ১৯-দফা কর্মসূচি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জাতীয় ঐক্যের মতো বিষয়গুলো ১৯-দফার ঐতিহাসিক ন্যায্যতা হাজির করে।

জিয়াউর রহমান দেখিয়েছিলেন, জাতীয় অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিষয়। জিয়াউর রহমান আরও দেখিয়েছিলেন যে, একটি রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড দিয়ে সার্বভৌম হয় না; তার অর্থনীতি যদি অতিরিক্ত পরনির্ভরশীল হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দুর্বল হয় এবং জনগণ যদি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে জাতির রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বও দুর্বল হতে বাধ্য।

বিএনপি তাই বিশ্বাস করে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বকে আলাদা দুটি বিষয় হিসেবে নয়, বরং পরস্পরনির্ভর দুটি স্তম্ভ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। বিএনপি জাতীয়তাবাদকে কেবল আবেগ নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত ভিত্তি হিসেবে কল্পনা করে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদের প্রভাব থেকে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জনগণকে সংগঠিত রাখার উপায় হিসেবেই জারি রাখতে চায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রে শাহাদাতবরণ করার পর ১৯৮২ সালে এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও সামরিক কর্তৃত্বের অধীনে চলে আসে। আশির দশকজুড়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রধান শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ও ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’র তকমা পান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির পক্ষে একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক যুক্তি তৈরি করে যে, দলটি শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি, বরং জনগণের অধিকারের প্রশ্নে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছে।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি পুনর্জন্ম লাভ করে। বিএনপি সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে রাষ্ট্রপতি-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেয়, যা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করে।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের পর নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন এক নতুন রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিতের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত করে এবং সেই ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর বেগম খালেদা জিয়াকে সরকার পরিচালনায় যথেষ্ট বেগ পেতে হয় তাঁর আপসহীন ও আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানের কারণে। বিশ্ব পরাশক্তি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব এশিয়ার দুটি দেশ ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলা করে বসে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক চরম প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

বেগম খালেদা জিয়া আমেরিকার চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অনুরোধ উপেক্ষা করে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান গ্রহণের ফলে নানামুখী চাপের মধ্যে সরকার পরিচালনা করতে থাকেন। যার অমোঘ পরিণতি হিসেবে ভারত-মার্কিনিদের প্রযোজনার ১/১১-এর অবৈধ সরকারের হাতে পরিবার-পরিজনসহ তাঁর দল বিএনপি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মধ্যে পতিত হয়।

২০০৮ সালের আধিপত্যবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হেরে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই পরাশক্তির অন্যায্য এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করে। যার ফলে স্পষ্ট আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের দল বিএনপির রাজনীতি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

দেশব্যাপী বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর চরম মাত্রার দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা এবং ফরমায়েশি রায়ের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার কারান্তরীণ হওয়ার পর দেশের বাইরে নির্বাসিত, চিকিৎসারত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে দল পুনর্গঠন এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হয়।

আওয়ামী লীগ সব রাষ্ট্রীয় কলকব্জা ব্যবহার করে বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। বিপরীতে তারেক রহমান জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক রূপে আবির্ভূত হন।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সফল হলে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান। তারেক রহমান দেশে ফিরে আসেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তারেক রহমান। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে বর্তমানে দেশ পরিচালনা করছে।

তারেক রহমানের বিএনপির নেতৃত্বে আসার ইতিহাস বেশ বন্ধুর। অনেক চড়াই-উতরাই পার করে, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে দলীয় রাজনীতির কারণে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তারেক রহমানকে বর্তমান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আপসহীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভরকেন্দ্র হিসেবে রায় দিয়েছেন। মূলত তাঁকে ঘিরেই দলীয় ও জাতীয় রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র, যা ভারত ও মিয়ানমারের প্রতিবেশী, বঙ্গোপসাগরের উপকূল এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বিএনপির ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া।

বিএনপি আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বকে তার পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাবে এবং সার্ক গঠনের মাধ্যমে সমগ্র উপমহাদেশকে একটি অভিন্ন স্বার্থের রাজনৈতিক অঞ্চল হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যেখানে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতাই হবে সম্পর্কের নিয়ামক।

৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন বিএনপির সামনে নতুন ধরনের পরীক্ষা হাজির করেছে। দীর্ঘ গণতন্ত্রহীনতা ও রাজনৈতিক সংকট শেষে পুনঃগণতান্ত্রিক উত্তরণের পর জনগণের প্রত্যাশা এখন কেবল সরকার পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। তারা কার্যকর প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা চায়।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফার রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার প্রস্তাবে মূলত পরিবর্তিত বাংলাদেশের গণআকাঙ্ক্ষা পূরণের রূপরেখাই তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অর্থনৈতিক উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে শহীদ জিয়া ‘উৎপাদনের রাজনীতি’ প্রস্তাব করেছিলেন, সেই লক্ষ্যে দিয়েছিলেন ১৯-দফা।

স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রহীনতার বিপক্ষে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান দলকে গণমানুষের দলে পরিণত করে। তিনি সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে দেশের বেসরকারি খাত ও অবকাঠামোকে একটা পর্যায়ে উন্নীত করেন। বাজারমুখী অর্থনীতি চালু করে বেগম জিয়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ব্যাপক পরিমাণে বাড়িয়ে দেশব্যাপী ব্যক্তিগত ধনসম্পদ অর্জনকে সহজ করে দেন।

বিএনপির রাজনীতির পক্ষে ঐতিহাসিক ন্যায্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলো হলো বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রে রাখা, গণমানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং অধিক প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার প্রচলন।

ঐতিহাসিক ন্যায্যতা আসলে কোনো রাজনৈতিক দলকে স্থায়ী নৈতিক ছাড়পত্র দেয় না। একটি রাজনৈতিক দল তখনই সত্যিকারের গণতন্ত্রের দল হয়ে ওঠে, যখন সে নিজের জন্য যে অধিকার দাবি করে, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের দলের জন্যও একই অধিকার স্বীকার করে। নিজের ভোটাধিকার রক্ষার পাশাপাশি অন্যের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে, নিজের রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা রক্ষা করে, নিজের নেতাকর্মীর নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের নিরাপত্তাকেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করে।

এই মানদণ্ডে বিএনপির যেমন ঐতিহাসিক পুঁজি আছে, তেমনি আছে ভবিষ্যতের জন্য বড় দায়িত্ব। বিএনপির রাজনীতিকে জনতার কাছে প্রাসঙ্গিক রাখতে হলে শুধু অতীত অর্জনকে মহিমান্বিত করলেই চলবে না; বরং অতীতের অর্জন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে।

গণআকাঙ্ক্ষা যদি রাজনীতির উৎস হয়, তবে গণতন্ত্র তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং সার্বভৌমত্ব তার রাষ্ট্রীয় ভিত্তি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যে নীতি ও আদর্শের কথা বিএনপি বলে এসেছে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় তার কার্যকর প্রয়োগই বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকছে।

লেখক: জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা

কেকে/এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close