জামালপুরে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম। শিল্পকলা একাডেমি জেলার শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ তথা চর্চাকেন্দ্র হলেও নেই শিল্পীদের আনাগোনা। অনেকটা নিরবে-নিভৃতে সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও সংগঠনকে সম্পৃক্ত না করে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে জেলা সংস্কৃতিক কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস করেন না।
মাঝে মধ্যে রাতের বেলায় অফিসে আসেন, থাকেন মধ্যরাত পর্যন্ত। সাংস্কৃতিক ব্যক্তি, কর্মী বা সংগঠকদের সঙ্গে নেই তার কোনো যোগাযোগ। শিল্পকলাতে কোনো কাজে গেলে উল্টো হয়রানি হতে হয় শিল্পীদের।
শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের জন্য সাংস্কৃতিক মাধ্যমের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নিয়ম মেনে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে। তবে শুধু প্রশিক্ষণই নয় জেলার শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের চর্চা ও বিকাশের প্রধান বাতিঘর এ প্রতিষ্ঠানটি।
একসময় শিল্পীদের পদচারণায় সর্বদা প্রাণচঞ্চল হয়ে থাকত জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণ। এখন সেখানে শিল্পীদের তেমন আনাগোনা দেখা যায় না। শহরের প্রাণকেন্দ্রে সিংহজানী উচ্চবিদ্যালয় সড়কের পাশে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সুবিশাল চকচকে নতুন ভবন দৃশ্যমান থাকলেও দুপুর হলেই সেখানে নেমে আসে শুনশান নিরবতা। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম খোলা থাকার কথা থাকলেও দুপুর বেলা সেখানে কাউকে পাওয়া যায় না।
বর্তমানে জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা হিসেবে তমাল বোস জামালপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কর্মরত রয়েছেন। শিল্পকলা একাডেমি ভবনের দ্বিতীয় তলায় তার কার্যালয়, কিন্তু তিনি কখনোই দিনের বেলা অফিসে আসেন না। এ কারণে শিল্পকলায় কর্মরত অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও দিনের বেলায় নিয়মিতভাবে খুব একটা দেখা যায় না।
সকালের দিকে কর্মরত ব্যক্তি বা অন্যান্যদের দেখা গেলেও দুপুর না হতেই শিল্পকলা একাডেমির ভবনে ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়। এ সময় ভবনে কেউ থাকেন না, প্রতিটি কক্ষই থাকে তালাবদ্ধ। কেউ কোনো প্রয়োজনে শিল্পকলায় এসে জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তাকে না পেয়ে ফোন করলে বেশীরভাগ সময় তিনি ফোন ধরেন না। অন্যান্য কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের ফোন করলে বিকাল বা সন্ধ্যার পর আসতে বলেন। এতে করে হয়রানির শিকার হন সরকারি সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা।
অভিযোগ রয়েছে, সাংস্কৃতিক কর্মকর্তার সঙ্গে জেলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ বা শিল্পীদের কোনো যোগাযোগ বা সমন্বয় নেই। তারা কোনো প্রয়োজনে সাংস্কৃতিক কর্মকর্তাকে পাশে পায় না। তাছাড়া কোনো অনুষ্ঠান থাকলেও সাংস্কৃতিক ব্যক্তি, কর্মী বা শিল্পীদের তিনি ডাকেন না। সরকারি অনুষ্ঠানগুলোতে প্রতিভাবান শিল্পীদের বাদ দিয়ে নিজের পরিবারের সদস্যদের শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির শীততাপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তনে পাঁচশ দর্শকের জন্য আসন রয়েছে। কিন্তু এ সব অনুষ্ঠানের পূর্বে দর্শক আকর্ষণের জন্য তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণাও করা হয় না। সাংস্কৃতিক ব্যক্তি বা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণও জানানো হয় না। বেশীর ভাগ অনুষ্ঠানেই দর্শক উপস্থিতি থাকে একেবাইে নগন্য। এমন নানা কারণেই জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই।
গত পহেলা বৈশাখে জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসনের অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে অনুষ্ঠান পরিচালনা বাদ দিয়ে মঞ্চ ত্যাগ করেন সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা। এরপর যন্ত্রশিল্পীরা বাদ্যযন্ত্রসহ মঞ্চ ত্যাগ করে প্রশাসনের অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে আরেকটি অনুষ্ঠানে চলে যান। এ কারণে সূচিতে থাকার পরও দুইটি সংগঠন তাদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা থেকে বঞ্চিত হয়। পরে ওই দুই সংগঠন অনুষ্ঠান বর্জন করে চলে যায়।
চলতি অর্থবছরে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অনুদান প্রাপ্তির জন্য আবেদন ফরমে সংযুক্ত কাগজপত্রে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা কর্তৃক সত্যায়িত করার বিধান না থাকলেও সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা অহেতুক সত্যায়িত করার বিধান জারি করেন। এতে করে হয়রানির শিকার হয় বিভিন্ন সংগঠন ও শিল্পীরা। দিনের বেলায় অফিসে না থাকায় অনুদানের ফরমে কেউ সাংস্কৃতিক কর্মকর্তার স্বাক্ষর নিতে পারে নি। পরে সবাই স্বাক্ষর ছাড়াই সংশয় নিয়ে অনুদানের আবেদন জমা দেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা তার নিজের পছন্দ অনুযায়ী সংগঠন বা শিল্পীদের আবেদনগুলো অনুদানের জন্য চূড়ান্ত করেন। এতে করে অনেক সক্রিয় সংগঠন অনুদানের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় এবং নিষ্ক্রিয় বা নামসর্বস্ব সংগঠনগুলো অনুদান পেয়ে থাকে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্যার কোনো কোনো সপ্তাহে একদিনও অফিসে আসেন না। মাসে তিন থেকে চার দিন অফিস করেন। দিনের বেলা তিনি একেবারেই আসেন না। অনেকেই বিশেষ করে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা স্যারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। কিন্তু স্যার অফিসে থাকেন না। কেউ স্যারের কথা জিজ্ঞেস করলে বলি- স্যার ডিসি অফিসে মিটিং করেন বা স্যার ঢাকায় আছেন অথবা ব্যাংকে আছেন। তবে প্রয়োজন হলে তিনি রাতের বেলা অফিসে আসেন, অনেক রাত পর্যন্ত অফিসে থাকেন।
জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) জামালপুর জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মামুন সারগাম বলেন, ‘জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা একজন অযোগ্য ব্যক্তি। তিনি নিয়মিত অফিসে আসেন না। কোনো কাজে গেলে দিনের বেলায় কখনোই তাকে পাওয়া যায় না। তিনি মাঝে মধ্যে রাতের বেলা অফিসে আসেন। জেলার শিল্পীদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ বা সমন্বয় নেই। শিল্পকলার কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তি বা সংগঠনকে আমন্ত্রণ জানান না। অন্যান্য শিল্পীদের পরিবর্তে তিনি তার পরিবারের সদস্যদের শিল্পী হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দেন। শিল্পকলায় প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। তার নিষ্ক্রিয়তার কারণে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।’
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, ‘জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা মিটিং এর নাম করে কোথায় থাকেন তা কেউ জানে না। অনেকটা অন্তরালে থেকে তিনি শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনা করেন। এখানে জেলা প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। জামালপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে উজ্জীবিত রাখতে আমি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছি।’
জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা তমাল বোস বলেন, ‘আমি অফিসে না থাকলে শিল্পকলা একাডেমি কিভাবে চলে। আমি অফিসে থাকি, আবার বাইরে চলে আসি, পরে আবার যাই। জামালপুরের সব সংগঠনের সঙ্গেই আমার ভালো সম্পর্ক আছে। আমার বিরুদ্ধে কেউ যদি কোনো অভিযোগ করে থাকে তবে তাকে সন্ধ্যার পরে আমার অফিসে নিয়ে আসবেন।’
জামালপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সংগীত, নৃত্য, চারুকলা, তলাযন্ত্র বিষয়ে গত বছর প্রশিক্ষণার্থী ছিলো ১৬৩ জন। চলতি বছর কমে ভর্তি হয়েছে ১২২ জন প্রশিক্ষণার্থী। কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন ৮ জন। তাদের মধ্যে লাইট অপারেটর, সাউন্ড অপারেটর, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও নৈশ্য প্রহরীসহ অস্থায়ী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ৫ জন।
কেকে/এআই