গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার ৭৮ শতাংশ জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। একই সময়ে ৫৫ শতাংশ কারখানা জানিয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার বাতিল বা কমিয়ে দিয়েছেন।
সংকটের পাশাপাশি জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে অতিরিক্ত ব্যয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠিয়েছে কিংবা ক্রেতাদের ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে।
তবে এখনো তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রয়েছে ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও নেক্সটের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী ৪এ ইয়ার্ন ডাইং। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সাল থেকে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সৌরবিদ্যুৎসহ নিজস্ব গ্যাস ও ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানার বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে।
ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত ৪এ ইয়ার্ন ডাইংয়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ শ্রমিক কাজ করেন। কারখানাটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে এবং বাকি অংশ প্রধানত নিজস্ব গ্যাস ও ডিজেলচালিত উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে আসে। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট তৈরি হলেও আপাতত উৎপাদন চালু রাখতে পারছে প্রতিষ্ঠানটি।
৪এ ইয়ার্ন ডাইংয়ের সহ-মালিক আবদুল্লাহ হিল নাকিব বলেন, ‘আমরা কখনো একটি মাত্র জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করিনি। সবকিছুর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছি। আমাদের এক ধরনের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। তবে ব্যবসার খরচ বেড়েছে। প্রথমে তেলের সংকট ছিল, পরে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে।’
তিনি জানান, ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যয় ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়েছে। এতে মাসিক জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
সোমবার বাংলাদেশে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানোর পর পোশাকশিল্পের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন কমাতে শিল্প-পর্যায়ের ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে ৪এ ইয়ার্ন ডাইং। বিদ্যুৎ ও অন্যান্য উৎসে সমস্যা দেখা দিলে এতে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত কারখানার কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হবে।
নাকিব বলেন, ‘আমরা বাড়তি খরচ সামাল দিতে পেরেছি। কিন্তু সব কারখানার পক্ষে তা সম্ভব নয়।’
জ্বালানির দাম বাড়ায় বাড়ছে চাপ
গ্যাস আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের শিল্পোৎপাদন প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এবং গ্যাসে ভর্তুকির ব্যয় বাড়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়েও চাপ তৈরি হচ্ছে বলে গত সপ্তাহে জানিয়েছেন বাংলাদেশের বিদ্যুৎমন্ত্রী।
দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এর অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় কিছু পোশাক প্রস্তুতকারক নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত ব্যয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠিয়েছে। কেউ কেউ ক্রেতাদের ছাড়ও দিয়েছে।
পোশাক রপ্তানিকারক শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘আমাদের মুনাফার পরিমাণ এমনিতেই খুব কম। জ্বালানির দাম বাড়ায় তা আরও সংকুচিত হবে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা আমাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।’
তিনি জানান, কানাডার এক ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে ২৫ হাজার পোশাক নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮ হাজার পণ্যের অর্ডার দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে এই বাড়তি ব্যয়ের চেয়েও গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে বেশি উদ্বেগজনক মনে করছেন কিছু ব্যবসায়ী। কারণ, বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক উৎপাদনকারী দেশ ভারত ও ভিয়েতনামে একই মাত্রায় এ ধরনের সমস্যা নেই বলে মনে করছেন তারা।
এইচঅ্যান্ডএমসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘অন্যান্য সোর্সিং দেশের সঙ্গে আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারব, নাকি পিছিয়ে পড়ব—তা নির্ভর করবে আমরা পরিস্থিতি কতটা ভালোভাবে সামাল দিতে পারি তার ওপর।’
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ