ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। চারপাশে রাতের আবহের রেশ। ফজরের আজান শেষ হতে না হতেই কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া পৌরসদরের পাটমহাল এলাকায় শুরু হয় ব্যস্ততা। বাজারের অন্য অংশ তখনও অনেকটা নীরব। অধিকাংশ দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। অথচ পাটমহালের পানের হাটে তখন যেন অন্য এক দৃশ্য।
মুহূর্তেই জমে ওঠে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। কারও হাতে পানের ভিরা, কারও কাঁধে ঝুড়ি, কেউ আবার মাথায় করে নিয়ে আসছেন পানবরজ থেকে সদ্য তোলা পান। হাটের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি পান। কোথাও কৃষক পান সাজিয়ে বসেছেন, কোথাও পাইকার ব্যস্ত পান বাছাইয়ে। কোনো জায়গায় চলছে দরদাম, আবার কোথাও দ্রুত পান গুনে বস্তা ও ঝুড়িতে ভরা হচ্ছে।
একদিকে কৃষক ও পাইকারের দর-কষাকষি, অন্যদিকে পান পরিবহনের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে রাতের শেষভাগ থেকে সকাল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার জন্য পাটমহাল পরিণত হয় এক বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্রে। কেউ অটোরিকশায়, কেউ সিএনজিতে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার কেউ টমটম, ভ্যান ও বাইসাইকেলে করে পান নিয়ে আসছেন। অনেক কৃষক আগের দিন সন্ধ্যায়ই পান নিয়ে হাটে এসে অবস্থান করেন। হাটে প্রবেশের পর শুরু হয় পান বাছাই, ভিরা বাঁধা ও বিক্রির প্রস্তুতি।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররা একের পর এক পান কিনে জমা করছেন। কেউ পাতার আকার দেখছেন, কেউ রং ও সতেজতা পরীক্ষা করছেন। আবার কেউ পানের জাত ও মান অনুযায়ী দাম ঠিক করছেন। কেনাবেচা শেষ হলেই শুরু হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারের উদ্দেশে পান নিয়ে ছুটে চলা।
সকাল গড়ানোর আগেই শেষ হয়ে যায় মূল বেচাকেনা। সপ্তাহে দুই দিন—শনিবার ও বুধবার—বসে এই পানের হাট। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকদের হিসাবে, প্রতিটি হাটে প্রায় এক কোটি টাকার পান কেনাবেচা হয়। শীত মৌসুমে পানের চাহিদা ও দাম বাড়লে প্রতিটি হাটে লেনদেন প্রায় দেড় এক কোটি টাকা। তবে উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে, প্রতিটি হাটে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়।
পাকুন্দিয়ার এই পানের হাট শুধু স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পান বিক্রির স্থান নয়; এটি উপজেলার কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও কৃষকেরা এখানে পান নিয়ে আসেন। ভালো মানের পান কিনতে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা ছুটে আসেন।
পাটমহালের পানের হাটের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় রাতের শেষভাগ থেকে ভোর। যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকেন, তখনই কৃষক, পাইকার, শ্রমিক ও পরিবহনকর্মীদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে হাট। হাটে বাছাই ও প্যাকেজিং শেষে পানের ঝুড়ি ও বস্তা তুলে দেওয়া হয় পিকআপভ্যান, অটোরিকশা, সিএনজি, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে।
এখান থেকে কেনা পান যাচ্ছে ঢাকা, গাজীপুর, কাপাসিয়া, ভৈরব, কটিয়াদী, নরসিংদী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে। বরজ থেকে হাট, হাট থেকে পাইকারি বাজার, এরপর খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায় পাকুন্দিয়ার পান। এই দীর্ঘ বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই জড়িয়ে আছে কৃষক, পাইকার, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জীবিকা।
পাকুন্দিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে পানচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার দরদরা, বরাটিয়া, হিজলীয়া, লক্ষীয়া, নামালক্ষীয়া, সৈয়দগাঁও, হোসেন্দী চরপাড়া, মির্জাপুর ও বাহাদিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পান চাষ হয়ে আসছে। কোনো কোনো পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে পান চাষের সঙ্গে যুক্ত। বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখে এখনো পানবরজের পরিচর্যা করছেন তারা। আবার অনেক পরিবার ধান ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি নতুন করে পান চাষ শুরু করেছে।
হিজলীয়া গ্রামের পানচাষি এম এস আল মামুন বলেন, “আমার বাবা পান চাষ করেছেন, দাদাও করেছেন। বংশপরম্পরায় আমরাও এই চাষ করে আসছি। আমার মতো গ্রামের আরও অনেক কৃষকের পানবরজ রয়েছে। পান চাষের আয় দিয়েই আমাদের সংসার চলে।”
নামালক্ষীয়া গ্রামের পানচাষি শাহিদ মিয়া বলেন, “আমাদের পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে পান চাষের প্রচলন রয়েছে। আমার বাবা পাকিস্তান আমল থেকেই পান চাষ করতেন। এই পান চাষের আয় দিয়েই বাবা আমাদের সব ভাই-বোনকে পড়ালেখা করিয়েছেন।”
পানচাষি নিজাম উদ্দিন বলেন, “আগে জমিতে ধান চাষ করতাম। কিন্তু ধান চাষ করে খরচের তুলনায় লাভ খুবই কম হতো। বছরের পর বছর ধান চাষ করেও তেমন লাভ করতে পারিনি। পরে পান চাষ শুরু করি।”
কটিয়াদীর গচিহাটা থেকে আসা পাইকার হাবিবুর রহমান বলেন, “প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে পাকুন্দিয়ার এই হাট থেকে পান কিনছি। এখানকার পানের মান ভালো এবং বিভিন্ন জাতের পান পাওয়া যায়। ভোরে এসে পান কিনে আমরা বিভিন্ন এলাকার বাজারে নিয়ে যাই। পানের চাহিদা সারা বছরই থাকে, তবে শীত মৌসুমে চাহিদা ও দাম দুটোই কিছুটা বাড়ে।”
ভৈরব থেকে আসা পাইকার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “পাকুন্দিয়ার পানের আলাদা একটা চাহিদা আছে। এখান থেকে পান কিনে ভৈরবের বাজারে নিয়ে যাই। ভালো মানের পান হলে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। হাটে যদি আরও ভালো পরিবহন ও প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে ব্যবসা আরও বাড়বে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পাকুন্দিয়ার পান এখানকার বাজার ছাড়িয়ে বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারেও পরিচিত। বিশেষ করে লালডিঙি ও বয়াসুর জাতের পানের চাহিদা বেশি। পানের আকার, পুরুত্ব, সতেজতা ও মানের কারণে পাইকারদের কাছে এসব পান জনপ্রিয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূর-ই-আলম বলেন, “পাকুন্দিয়া উপজেলায় প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে পান আবাদ হচ্ছে। এখানে মূলত লালডিঙি ও বয়াসুর—এই দুই জাতের পান চাষ করা হয়। এর মধ্যে আকারে বড় ও পুরু হওয়ায় লালডিঙি পান কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের কাছেই বেশ জনপ্রিয়। এই বাজারে সপ্তাহে দুই দিন পানের হাট বসে। প্রতিটি হাটে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়।”
নিরাপদ পান উৎপাদনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অনেক কৃষক কীটনাশক ব্যবসায়ীদের পরামর্শে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করেন। পান সরাসরি খাওয়া হয় বলে অনুমোদনহীন বা মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
কেকে/ এমএস