ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গাজীপুরের কাপাসিয়া অংশে একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বাঁকের মুখে গতি কমানোর পরিবর্তে বেপরোয়া গতিতে ওভারটেকিং, বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনকে পর্যাপ্ত জায়গা না দেওয়া এবং সরু দুই লেনের সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ—সব মিলিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী সিএনজি অটোরিকশার চালকদের দ্রুতগতিতে চালানো ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।
টোক থানার ঘাট থেকে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার সড়কজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৫টি বাঁক রয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। এর মধ্যে কয়েকটি বাঁকে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন আগে থেকে দেখা যায় না। ফলে বাঁকের মুখে ওভারটেকিং করলে মুহূর্তেই মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও রাজেন্দ্রপুর-কাপাসিয়া-টোক সড়কের সরু অংশ ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের বিষয়টি উঠে এসেছে। গত আগস্টে সড়ক সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের সময় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে ঝোপঝাড় পরিষ্কার, রোড রিফ্লেক্টর পুর্নচিত্রায়ন ও গর্ত সংস্কারের কাজ করা হয়েছিল। সে সময় কাপাসিয়া-টোক অংশে অন্তত ২৫টি উচ্চঝুঁকির বাঁকের চিন্হ রাস্তার পাশে লাগিয়েছে গাজীপুর সড়ক বিভাগ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক চালক বাঁকের কাছে এসেও গতি কমান না। বরং সামনে থাকা ধীরগতির যানবাহনকে অতিক্রম করতে গিয়ে বিপরীত লেনে ঢুকে পড়েন। একই সময়ে বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক কিংবা সিএনজি এলে চালকের হাতে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় থাকে না।
কাপাসিয়া-টোক-কিশোরগঞ্জ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই সরু ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আলোচিত। ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনে রাজেন্দ্রপুর-কাপাসিয়া-কিশোরগঞ্জ সড়ককে মাত্র ১৮ ফুট প্রশস্ত বলে উল্লেখ করে বিভিন্ন স্থানে তীব্র বাঁক ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়েও সড়কটি প্রশস্ত করার উদ্যোগের কথা এসেছে। চলতি বছরের আগস্টে কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া-টোক-কাপাসিয়া-রাজেন্দ্রপুর সড়ক চার লেনে উন্নীত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ঝুঁকির বাস্তব চিত্র দেখা গেছে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালেও। কাপাসিয়ার টোক ইউনিয়নের বীরউজলী বাজার এলাকায় ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে ডাম্পট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও চারজন।
নিহতদের একজন শামীম মিয়া (৪৫), তিনি সিএনজি অটোরিকশার চালক ছিলেন। অন্য নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। দুর্ঘটনায় আহতদের কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়।
প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও পরে আহতদের একজনের মৃত্যুর পর নিহতের সংখ্যা বেড়ে দুইজনে দাঁড়ায়।
ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটে নিয়মিত চলাচল করছে উজানভাটি, অনন্যা, অনন্যা ক্লাসিক ও জলসিঁড়ি পরিবহনের বাস। এ ছাড়া টোক থেকে গাজীপুর রুটে রাজদূত ও পথের সাথী এবং কাপাসিয়া থেকে সম্রাট পরিবহনের যানবাহন চলাচল করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই লেনের এ সড়কে যাত্রীবাহী বাস, সিএনজি, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, মোটরসাইকেলসহ নানা ধরনের যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করায় বাঁকগুলোতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে দ্রুতগতির বাস ও ছোট যানবাহন একই সময়ে বাঁকে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের আগস্টের জাতীয় প্রতিবেদনে অতিরিক্ত গতি, যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো, বেপরোয়া চালনা, চালকের অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কাপাসিয়ার এ সড়কের ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের অভিযোগ—বাঁকের আগে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, গতি নিয়ন্ত্রণ, দৃশ্যমান সাইনবোর্ড ও ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
গত এক মাসে কাপাসিয়া অংশে ঠিক কতটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, কতজন নিহত ও আহত হয়েছেন—এর পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলো দিয়ে এক মাসের মোট সংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে ১৮ সেপ্টেম্বর বীরউজলী বাজারের দুর্ঘটনায় দুইজন নিহত ও চারজন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।
এ কারণে গত এক মাসের প্রকৃত চিত্র জানতে সালনা হাইওয়ে থানা, কাপাসিয়া থানা, টোক তদন্ত কেন্দ্র, কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের দুর্ঘটনা রেজিস্টার যাচাই করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দারা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো চিহ্নিত করে বাঁকের আগে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, রোড মার্কিং ও রিফ্লেক্টর বসানো, বাঁকের মুখে গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, অতিরিক্ত ওভারটেকিং বন্ধে কার্যকর নজরদারি এবং সড়কের প্রয়োজনীয় অংশ প্রশস্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান নয়—দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে দুই লেনের এ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানবাহনের চাপ যত বাড়বে, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তত বাড়বে।
সালনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, আগস্ট মাসে আহত ৭ জন নিহত হয়েছেন ২জন। নিয়মিত মালমা হয়েছে দুইটি। সেপ্টেম্বর নিহত হয়েছে ৩ জন আহত হয়েছেন ৬ জন নিয়মিত মামলা দুইটি।
কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, গত আগস্ট মাসে কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হয়েছে ১৬০ জন। মারা গেছেন ২ জন।
কাপাসিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ওয়ার হাউস ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, গত আগস্ট মাসে সড়কে ২টি স্থানে দূর্ঘটনা আহত হয়েছে ২ জন।
কেকে/এআই