পাহাড়, টিলা আর ঘন বনাঞ্চল কেটে মৌলভীবাজারে গড়ে উঠছে একের পর এক বিলাসবহুল ও নামসর্বস্ব ইকো-রিসোর্ট। পর্যটনের প্রসারের নামে পরিবেশ ধ্বংসের এমন উৎসব চললেও প্রশাসনের কাছে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য। কারা এ সব রিসোর্ট তৈরি করছে, এদের বৈধতা আছে কি না-তার কোনো উত্তর নেই সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি দপ্তরে। নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জেলাজুড়ে অনুমোদনহীন এ সব রিসোর্টের সংখ্যা এখন ছাড়িয়েছে দুই শতাধিক। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তথ্য।
জানা যায়, ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর প্রথম সারির কয়েকটি মানসম্মত রিসোর্ট যাত্রা শুরু করে। তবে গত কয়েক বছরে জেলায় বেপরোয়াভাবে শুরু হয়েছে রিসোর্ট ব্যবসার নামে অবৈধ দখল ও নির্মাণকাজ। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় এ প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শুধু শ্রীমঙ্গল উপজেলাতেই গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট, যার মধ্যে রাধানগর এলাকাতেই রয়েছে প্রায় অর্ধশত।
স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বহিরাগতরা কয়েক শতক জমি কিনে পাহাড় কেটে কিংবা ২-৩টি ঘর তুলে সেটিকে ‘রিসোর্ট’ নাম দিয়ে বাণিজ্য করছেন। মূলধারার পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, জেলায় ২০০টির মতো রিসোর্ট থাকলেও প্রকৃত অর্থে রিসোর্টের সুযোগ-সুবিধা ও মান বজায় রাখছে মাত্র ১০-১২টি প্রতিষ্ঠান।
রিসোর্টের ভেতরে কার্যক্রম নিয়ে সংশয় অনুমোদনহীন
অধিকাংশ রিসোর্টের ভেতরে কী কার্যক্রম চলে তা নিয়ে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে। নামধারি এ সব রিসোর্টের অনেকগুলোতেই সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। দিন কিংবা রাতেও সেখানে বহিরাগত ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। অধিকাংশ রিসোর্টেই নেই কোনো সিসি ক্যামেরা বা নৈশপ্রহরী। মালিক ও ম্যানেজার একই ব্যক্তি হওয়ায় ভেতরে কী ঘটছে, তা নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। সম্প্রতি সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের শ্রীমঙ্গলে একটি রিসোর্টে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর রাতারাতি নাম পরিবর্তন করার খবরও পাওয়া গেছে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ জানান, জেলায় প্রায় দুই শতাধিক রিসোর্টের মধ্যে শ্রীমঙ্গলেই শতাধিক। অথচ প্রকৃত অর্থে রিসোর্ট বলা যায় এমন প্রতিষ্ঠান ১০-১২টির বেশি হবে না। ৩-৪ টি রুম ভাড়া নিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে চালানো হচ্ছে। এরা কারা, আমাদের জানা নেই।
সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এসকে দাশ সুমন বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর লাখ টাকার উপরে কর দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করছি। অথচ কেউ দুই শতক জায়গা কিনে কয়েকটি রুম বানিয়েই রিসোর্ট ব্যানার টাঙিয়ে দিচ্ছে। রিসোর্ট তৈরি করতে প্রচুর জায়গা, নিরাপত্তা ও কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। সামান্য অনুমোদন প্রক্রিয়া জোরদার হলেও এ ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে আসত।’
পরিবেশের বিপর্যয় ও প্রাণিকুলের হুমকি
বন ও পাহাড় কেটে রিসোর্ট বানানোর ফলে মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে মৌলভীবাজারের প্রাণপ্রকৃতি। প্রাণীদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ধ্বংস করে উঁচু টিলা ও গভীর বনের ভেতর কটেজ নির্মাণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আসম সালেহ সোহেল বলেন, ‘পাহাড়-টিলা কেটে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে কার ছায়ায় এ সব রিসোর্ট হচ্ছে তা সরকারের কোনো দপ্তর তদারকি করে না। একের পর এক সরকারি দপ্তরের অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তার তোয়াক্কা করছে না। অনতিবিলম্বে কঠোর নীতিমালা করে পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
দায় এড়ানোর জাঁতাকলে প্রশাসন
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এ বিশাল অবৈধ কাঠামোর দায় নিতে রাজি নয় সরকারের কোনো দপ্তরই। এক দপ্তর ঠেলে দিচ্ছে অন্য দপ্তরের ঘাড়ে।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম জানান, ২০টির বেশি কক্ষ রয়েছে এমন মাত্র ৬০ টি রিসোর্ট তাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকি শতাধিক রিসোর্ট কার অনুমোদনে চলছে, তা তাদের জানা নেই।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘কে রিসোর্ট করছে, কে অনুমতি দিচ্ছে এ সব আমার জানা নেই। রিসোর্টের বিষয় নিয়ে আমাদের আরও চিন্তা করা উচিত। আমরা ইতোমধ্যে একটা তালিকা করেছি। রিসোর্ট তৈরির জন্য একটা নীতিমালা করা দরকার। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন করা আমি প্রয়োজন মনো করি।’
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘আমরা প্রধানত পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল-রিসোর্টগুলো তদারকি করি। ছোট ছোট রিসোর্টগুলো হয়তো কোনো না কোনো বিভাগ থেকে অনুমোদন নিচ্ছে, আবার নাও নিতে পারে। এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানা নেই।’
স্থানীয়দের দাবি, পর্যটনের উন্নতির কথা চিন্তা করেই গ্র্যান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টের এর যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ক্যাটাগরির রিসোর্ট তৈরি হতে থাকে। গত ৩-৪ বছরে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়াভাবে গড়ে উঠছে নামে রিসোট-কটেজ। এ সব রিসোট-কটেজ কিভাবে হচ্ছে কার অনুমতি নিয়ে হচ্ছে তা তদারকি করা খুবই প্রয়োজন।
কেকে/এআই