মহম্মদপুরে সর্বগ্রাসী আগুনে পুড়ল বিধবা ঝর্নার স্বপ্ন ও শেষ সম্বল
মাগুরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৫ পিএম
ঝর্না বেগমের আহাজারী
প্রচণ্ড তোড়ে ফুঁসে ওঠা মধুমতি নদীর ভাঙনে তিন-তিনবার জীবনের শেষ সম্বল হারিয়েছিলেন। স্বামী রাজা মিয়া ছিলেন মাদ্রাসার একজন সাধারণ কর্মচারী; তার মৃত্যুর পর একা হাতেই সংসারের হাল ধরেছিলেন তিনি। জীবনসংগ্রামের প্রতিবারই বুকভাঙা কষ্ট চেপে নিঃস্ব হাতে নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করেছিলেন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ঝামা গ্রামের সাবেক ওয়ার্ড সদস্য, এই বিধবা নারী ঝর্না বেগম। কিন্তু নিয়তি বোধহয় তার জন্য কেবলই আক্ষেপ লিখে রেখেছে! নদীভাঙন আর স্বামী হারানোর দগদগে ক্ষত সামলে নদীর পাড়েই টেনেটুনে দাঁড় করানো নতুন স্বপ্নের ঘরটি মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখায় ছাই হয়ে গেছে। আগুনে কেবল আসবাবপত্র আর নগদ সম্বলই পোড়েনি, ভস্মীভূত হয়ে গেছে অসহায় পরিবারটির বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে উপজেলার ঝামা গ্রামে এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে হঠাৎ বিকট শব্দে বসতবাড়ির বৈদ্যুতিক মিটারটি বিস্ফোরিত হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনের বিকট শিখা চারপাশের কাঠের ও টিনের ঘরটিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাটি দুর্গম ও প্রত্যন্ত হওয়ায় খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই পুরো বাড়ি আগুনে গ্রাস করে ফেলে। পরে স্থানীয়রা জীবন বাজি রেখে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও ততক্ষণে ভেতরের সমস্ত আসবাব, পরিধেয় বস্ত্র ও মূল্যবান জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
ছবি : প্রতিনিধি
এমনকি সম্প্রতি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খেত থেকে তুলে আনা স্বপ্নবোনা পাটের স্তূপগুলোও পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। এতে প্রাথমিকভাবে আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
স্বামীহারা নিঃস্ব ঝর্না বেগম পোড়া ভিটায় বসে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘স্বামীকে হারিয়ে এমনিতেই একলা হয়ে গিয়েছিলাম, তারপর নদীর সাথে যুদ্ধ করতে করতে তিন-তিনবার আমার ঘর সরাইছি। নদীর গ্রাস থেকে কোনোরকমে বেঁচে এসে এবার একটু নতুন করে মাথা গুঁজে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এই সর্বগ্রাসী আগুন এক নিমেষেই আমাকে আর আমার পরিবারকে খোলা আকাশের নিচে এনে দাঁড় করাল! এমন পোড়া কপাল মানুষের কীভাবে হয়?’
ঘটনার আকস্মিকতায় দিশেহারা ঝর্না বেগমের হৃদয়বিদারক বিলাপ ও ছাইয়ের মধ্য থেকে শেষ সম্বলটুকু খোঁজার ব্যর্থ আকুতিতে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী। তিনি শোকে পাথর হয়ে যাওয়া ঝর্না বেগম ও তার পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়িয়ে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে শুকনো খাবার ও কম্বল বিতরণ করেন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির দ্রুত পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ আর্থিক ও বস্তুগত সহায়তার আশ্বাস দেন।
একই সময়ে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শন করেন মহম্মদপুর প্রেস ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মেহেদী হাসান পলাশ। তিনি অসহায় পরিবারটির সার্বিক ক্ষতি দেখে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন ও সরকারের কাছে ঝর্না বেগমের পরিবারকে পুনরায় মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়ার আকুল আহ্বান জানান।
স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এখন বিত্তবান ও সরকারি-বেসরকারি মানবিক সহায়তার দিকেই চেয়ে আছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি।