একজনের শরীরে ডেঙ্গু, পাশের বেডেই চিকিৎসা নিচ্ছেন অন্য রোগী। অথচ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শয্যার পাশে নেই মশারি। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে তাই সাধারণ রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও ডেঙ্গু নিয়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। কারও অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে মশারি দেওয়া হয়নি; আবার কর্তৃপক্ষের দাবি, মশারি দেওয়া হলেও অনেক রোগী তা ব্যবহার করেন না।
কিশোরগঞ্জে ডেঙ্গুর সংক্রমণও থামছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪৪ জন। এ নিয়ে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত চলতি বছরে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩২১ জনে। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ২২৪ জন। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১০৭ জন। সবচেয়ে বেশি ২৯ জন ভর্তি রয়েছেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের চতুর্থ তলার পেয়িং ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একই ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সাধারণ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও চিকিৎসা নিচ্ছেন। কয়েকজন ডেঙ্গু রোগীর শয্যার পাশে মশারি টাঙানো ছিল না।
ডেঙ্গু রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই হাসপাতাল থেকে মশারি পাননি। কেউ কেউ বাড়ি থেকে মশারি এনে ব্যবহার করছেন। এতে ডেঙ্গু রোগীর সুরক্ষার পাশাপাশি একই ওয়ার্ডে থাকা সাধারণ রোগীদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
করিমগঞ্জ থেকে আসা সুফিয়া আক্তারের ছেলে তিন দিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেসহ ডেঙ্গু রোগীদের কাউকেই হাসপাতাল থেকে মশারি দেওয়া হয়নি। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে মশারি খুবই জরুরি। আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড়ানোর পর ওই মশার মাধ্যমে অন্য মানুষের মধ্যেও ডেঙ্গু ছড়াতে পারে।’
পাশের বেডে থাকা রোগীর মা আকলিমা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে মশারি না দেওয়ায় বাড়ি থেকে মশারি নিয়ে এসেছি। তবে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের অনেক রোগীকেই মশারি ব্যবহার করতে দেখিনি।’
সাধারণ রোগী আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমি পেটে ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছি। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীদের কাছাকাছি থাকায় ভয় হচ্ছে। চিকিৎসা নিতে এসে যেন ডেঙ্গু নিয়ে বাড়ি ফিরতে না হয়, সেটাই চিন্তার বিষয়।’
রোগীর স্বজন রাকিব হোসেন বলেন, ‘কে ডেঙ্গু রোগী আর কে সাধারণ রোগী, দেখে বোঝার উপায় নেই। ডেঙ্গু রোগীকে কামড়ানো মশা অন্য রোগীকে কামড়ালে তারও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা রাখা এবং মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার।’
তবে হাসপাতালের এক নার্সের দাবি, রোগীদের নিয়মিত মশারি ব্যবহারের জন্য বলা হয়। মশারি দেওয়া হলেও অনেকে গরমের কারণে তা ব্যবহার করতে চান না। যদিও ওই নার্সকে সঙ্গে নিয়ে ডেঙ্গু রোগীদের কাছে গিয়ে কথা বলার সময় কয়েকজন রোগী হাসপাতাল থেকে মশারি না পাওয়ার অভিযোগ করেন।
বিষয়টি জানানো হলে ওই নার্স বলেন, ‘সবাইকে মশারি দেওয়া হবে। তবে রোগীরা মশারি ব্যবহার না করলে আমাদেরও কিছু করার থাকে না।’
করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধর ইউনিয়নের ইন্দাবাড়ি গ্রামের শাহাবুদ্দীন জানান, কয়েক দিন জ্বর থাকার পর পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। হাসপাতালে ভর্তি হলেও তিনি মশারি পাননি।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘কম জনবল নিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। মেডিকেল অফিসার ও ইন্টার্ন চিকিৎসকের সংখ্যাও রোগীর তুলনায় কম। তারপরও আমরা সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর পাশাপাশি কিছু রোগীর টাইফয়েডের মতো অন্য সংক্রমণও দেখা যাচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এ সব রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সাধারণত ডেঙ্গু রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় না; তবে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা দেওয়া হচ্ছে।’
ডা. আনোয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ওয়ার্ড, পৃথক চিকিৎসক ও নার্স থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। জাতীয় গাইডলাইন ও চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী আলাদা ব্যবস্থাপনা থাকলে রোগীদের সেবা দেওয়াও সহজ হবে।’
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে বর্তমানে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। ডেঙ্গুর বাইরে থাকা কিছু রোগীকে অন্যত্র স্থানান্তরের চেষ্টা করা হলেও তারা হাসপাতালে থাকতেই আগ্রহী। রোগী ও স্বজনদের কাউন্সেলিং করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ডের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক-নার্সসহ জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।’
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি বেড সংরক্ষণের বিষয়ে পরিচালককে জানিয়েছি। এর মধ্যে পুরুষ রোগীদের জন্য ২৫টি এবং নারী রোগীদের জন্য ২৫টি বেড রাখার কথা বলা হয়েছে। পরিচালকও এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগী ও সাধারণ রোগীদের মিশ্র অবস্থান সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এআই