পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা মেঘ, চারপাশে সবুজের সমারোহ আর দূরে পাহাড়ের পর পাহাড়—প্রকৃতির এমন অপরূপ দৃশ্য দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মারাইংতং পাহাড়ে। মেঘ, পাহাড় ও সবুজ প্রকৃতির মেলবন্ধনের কারণে জায়গাটি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
মারাইংতং বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মিরিঞ্জা রেঞ্জের একটি পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ ফুট। পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে একটি বৌদ্ধ জাদি ও বড় বুদ্ধমূর্তি।
চূড়ায় দাঁড়ালে চারপাশের পাহাড়, বনভূমি, মাতামুহুরী নদী ও নিচের জনপদের দৃশ্য চোখে পড়ে। ভোরে পাহাড়ের গায়ে মেঘের চাদর আর বিকেলে সূর্যাস্ত—দুই সময়েই বদলে যায় মারাইংতংয়ের সৌন্দর্য।
মারাইংতং পাহাড়ে যা দেখবেন
মারাইংতংয়ের প্রধান আকর্ষণ পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য। মেঘের ভেলা যখন পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভেসে যায়, তখন মনে হতে পারে আপনি যেন মেঘের রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছেন।
চূড়া থেকে আশপাশের পাহাড়ি বন, মাতামুহুরী নদী ও পাহাড়ের ভাঁজে গড়ে ওঠা জনপদ দেখা যায়। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে দূরের বিস্তৃত ভূদৃশ্যও চোখে পড়ে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্যও জায়গাটি আকর্ষণীয়।
মারাইংতং ভ্রমণের পাশাপাশি সময় থাকলে কাছাকাছি আলীর গুহা, ডিম পাহাড়, মায়া লেক, সীমান্তঘেঁষা সড়ক ও মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট ঘুরে দেখতে পারেন।
পাহাড়ের আশপাশে ত্রিপুরা, মারমা ও ম্রো জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। পাহাড়ের ভাঁজে থাকা এসব পাড়া এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাও এ অঞ্চলের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় আলাদা মাত্রা যোগ করে।
ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন
মারাইংতং যেতে ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদমগামী বাসে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাসে আলীকদমের আবাসিকএলাকায় নেমে স্থানীয় যানবাহন বা হেঁটে পাহাড়ের ট্রেইলের দিকে যেতে পারেন।
আরেকটি পথ হলো ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী বাসে চড়ে চকরিয়া বাস টার্মিনালে নামা। সেখান থেকে স্থানীয় বাস, জিপ বা চাঁদের গাড়িতে আলীকদমের দিকে যেতে হবে। আলীকদমে যাওয়ার পথে আবাসিক এলাকায় নেমে মারাইংতংয়ের ট্রেইলে যাওয়া যায়।
চকরিয়া থেকে আলীকদমের দূরত্ব প্রায় ৩২ কিলোমিটার। স্থানীয় যানবাহনে যেতে সময় লাগতে পারে দেড় ঘণ্টার মতো। তবে যানজট, রাস্তার অবস্থা ও যানবাহনের ধরন অনুযায়ী সময় কমবেশি হতে পারে।
ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদম যেতে মোটামুটি ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা সময় হাতে রাখা ভালো। বাসের ধরন ও রাস্তার পরিস্থিতির ওপর সময়ের তারতম্য হতে পারে।
পাহাড়ে উঠতে কত সময় লাগবে?
মারাইংতংয়ের চূড়ায় ওঠার পথ পাহাড়ি ও উঁচুনিচু। ট্রেইল ও কোন পথ ব্যবহার করছেন তার ওপর হাঁটার সময় নির্ভর করে। সাধারণত কয়েক ঘণ্টা সময় হাতে রেখে উঠতে হয়। নতুনদের জন্য পথটি কিছুটা কষ্টকর মনে হতে পারে।
স্থানীয়ভাবে চাঁদের গাড়ি বা মোটরযানে পাহাড়ের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ থাকলেও সব জায়গায় যানবাহন পৌঁছায় না। তাই শেষ অংশে হাঁটার প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়াই ভালো। ভালো গ্রিপের জুতা ব্যবহার করলে পাহাড়ি পথে হাঁটা তুলনামূলক নিরাপদ ও আরামদায়ক হবে।
কত টাকা খরচ হবে
ভ্রমণের মোট খরচ নির্ভর করবে বাস, স্থানীয় যানবাহন, খাবার ও দলগত ব্যবস্থার ওপর। চকরিয়া থেকে আলীকদমের স্থানীয় যানবাহনের ভাড়া সাম্প্রতিক বিভিন্ন ভ্রমণ গাইডে জনপ্রতি প্রায় ৭০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
আলীকদম থেকে মারাইংতংয়ের ট্রেইল পর্যন্ত স্থানীয় যানবাহনের ভাড়াও দূরত্ব ও বাহনের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। দল বড় হলে জিপ বা চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করে নেওয়া তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে।
তবে ভাড়া সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ায় যাত্রার আগে স্থানীয় চালক বা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বর্তমান ভাড়া জেনে নেওয়া ভালো।
ট্রেকিং করতে চাইলে
যারা ট্রেকিং পছন্দ করেন, তাদের জন্য মারাইংতং ভালো একটি গন্তব্য। পাহাড়ি পথ ধরে চূড়ার দিকে উঠতে হবে। পথের কোথাও কোথাও ঢাল বেশি হওয়ায় ধীরে ধীরে উঠতে হবে।
পাহাড়ি পথে পর্যাপ্ত পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা জরুরি। বর্ষায় পথ পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে। তাই এ সময় ভালো গ্রিপের জুতা ছাড়া ওঠা ঠিক হবে না।
কোথায় থাকবেন
একদিনে ঘুরে ফিরে আসাও সম্ভব। তবে সূর্যাস্ত, রাতের পাহাড়ি পরিবেশ কিংবা ভোরের মেঘ দেখতে চাইলে রাতে থাকার পরিকল্পনা করা যায়।
মারাইংতংয়ের চূড়ায় টেন্ট ক্যাম্পিং জনপ্রিয় হলেও সেখানে রাতযাপনের অনুমতি ও ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থা সময়ভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে টেন্ট ক্যাম্পিং নিয়ে প্রশাসনিক বিধিনিষেধের তথ্যও পাওয়া গেছে। তাই রাতে থাকার পরিকল্পনা করলে যাত্রার আগে স্থানীয় প্রশাসন বা ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বর্তমান অনুমতি ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নেওয়া জরুরি।
কখন যাবেন
মেঘের খেলা দেখতে চাইলে বর্ষার শেষভাগ থেকে শীতের শুরুর সময়টি আকর্ষণীয় হতে পারে। এ সময় আবহাওয়া ও মেঘের ওপর নির্ভর করে পাহাড়ের চূড়ায় ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়।
তবে বর্ষাকালে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকে এবং অতিবৃষ্টিতে যাতায়াতও কঠিন হতে পারে। শীতের দিকে আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকলে দূরের পাহাড় ও নিচের বিস্তৃত ভূদৃশ্য দেখার সুযোগ ভালো থাকে।
যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন
পাহাড়ে ভ্রমণের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা ভালো। পর্যাপ্ত পানি, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, ফার্স্ট এইড সামগ্রী, টর্চ ও পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে নিতে পারেন।
পাহাড়ি পথে একা না গিয়ে দলবদ্ধভাবে চলা নিরাপদ। আবহাওয়া খারাপ হলে বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোনো নিষেধাজ্ঞা দিলে তা মেনে চলতে হবে।
পাহাড়ে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে সঙ্গে করে নিচে নিয়ে আসুন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, ধর্মীয় স্থান ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানোও একজন দায়িত্বশীল পর্যটকের কর্তব্য।
শহরের ব্যস্ততা থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে মেঘে ঢাকা পাহাড়, সবুজ বন আর নীরব প্রকৃতির কাছে ফিরতে চাইলে মারাইংতং হতে পারে দারুণ এক গন্তব্য। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘের ভেলা দেখা কিংবা ভোরের আলোয় চারপাশের পাহাড় জেগে ওঠার দৃশ্য—দুটিই ভ্রমণের স্মৃতিতে আলাদা জায়গা করে নিতে পারে।
কেকে/সাশ