পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, ঘন অরণ্য আর মেঘে ঢাকা পাহাড়চূড়া। কোথাও শতবর্ষী গাছের সারি, কোথাও কুয়াশায় আচ্ছন্ন নীরব জঙ্গল। এরই মধ্যে দুর্গম পথ পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কির্সতং পাহাড়। প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও দুর্গম ট্রেকিংয়ের কারণে পাহাড়প্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে কির্সতং।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ ফুট উচ্চতায় চিম্বুক রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়ায় কির্সতং পাহাড়ের অবস্থান। ‘কির্সতং’ নামটি মারমা ভাষা থেকে এসেছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। ‘কির্স’ বলতে একটি বিলুপ্তপ্রায় পাখি এবং ‘তং’ বলতে পাহাড়কে বোঝানো হয়। একসময় পাহাড়ের চূড়ায় ওই বিরল পাখির দেখা মিলত বলে এর নাম কির্সতং হয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। ধনেশ পাখির আবাসস্থল হিসেবেও একসময় পরিচিত ছিল পাহাড়টি।
কির্সতংয়ের বৈশিষ্ট্য এর ঘন অরণ্য ও তুলনামূলক দুর্গম পরিবেশ। বিশাল গাছপালা, পাহাড়ি ঝিরিপথ, কুয়াশাচ্ছন্ন বন আর বন্য পরিবেশ মিলে এখানে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক আবহ। পাহাড়ের পথে এখনো বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণী ও পাখির দেখা মেলে বলে স্থানীয়রা জানান।
পথের প্রতিটি বাঁকে রোমাঞ্চ
কির্সতংয়ের চূড়ায় পৌঁছাতে হলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। আলীকদম থেকে পানবাজার হয়ে মোটরসাইকেলে ২১ কিলো এলাকায় পৌঁছানোর পর শুরু হয় মূল ট্রেকিং। ২১ কিলো থেকে তিন্দুর রাস্তা ধরে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছাতে হয় খেমচং পাড়ায়। এটিই অভিযাত্রীদের বেসক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
খেমচং পাড়ায় রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরে শুরু হয় পাহাড়ের চূড়ার উদ্দেশে যাত্রা। সেখান থেকে আরও প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা ট্রেকিং করে পৌঁছানো যায় কির্সতংয়ের চূড়ায়।
এই পথের বড় একটি অংশ গভীর ও গহিন ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে খেমচং পাড়া থেকে কির্সতংয়ের চূড়ার পথে কুয়াশায় ঢাকা জঙ্গল ভ্রমণকারীদের মধ্যে তৈরি করে রহস্যময় অনুভূতি। দুর্গম পথের কারণে পুরো যাত্রায় প্রয়োজন হয় শারীরিক সক্ষমতা, ধৈর্য ও মানসিক প্রস্তুতির।
ম্রো জনপদে ভিন্ন অভিজ্ঞতা
কির্সতং অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয় পাহাড়ে বসবাসরত ম্রো জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা দেখার সুযোগ। পাহাড়ের ছোট ছোট গ্রামে তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা, ঘরবাড়ি ও সংস্কৃতি ভ্রমণকারীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।
খেমচং পাড়ায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা সাধারণত স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরেই করা হয়। বাঁশ ও কাঠের তৈরি মাচাংঘরে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে হয়ে ওঠে এই অভিযানের অন্যতম স্মরণীয় অংশ।
স্থানীয়দের ঘরেই খাবারের ব্যবস্থাও করা যায়। সাধারণত ভাত, পাহাড়ি মুরগি, ডাল ও আলু ভর্তার মতো খাবার পরিবেশন করা হয়। তবে খাবারের ব্যবস্থা করতে হলে আগে থেকেই গাইড বা স্থানীয়দের জানিয়ে রাখতে হয়। দীর্ঘ ট্রেকিংয়ের জন্য সঙ্গে শুকনা খাবার ও পর্যাপ্ত পানি রাখার পরামর্শ দেন অভিজ্ঞরা।
কির্সতং পাহাড়ে শীতেই বেশি স্বস্তি
কির্সতং ভ্রমণের জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কে তুলনামূলক উপযোগী মনে করা হয়। এ সময় পাহাড়ি পথ সাধারণত অপেক্ষাকৃত শুষ্ক থাকায় ট্রেকিং কিছুটা সহজ হয়। তবে বর্ষার শেষ দিকে পাহাড়ের মেঘ-কুয়াশা ও সবুজ প্রকৃতির অন্যরকম সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
বর্ষায় অবশ্য ঝুঁকিও বাড়ে। পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যায় এবং জোঁকের উপদ্রব বেড়ে যায়। তাই এ সময়ে কির্সতং ভ্রমণে বাড়তি প্রস্তুতি প্রয়োজন।
যেভাবে যাবেন
কির্সতং যেতে প্রথমে ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে আলীকদম যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এরপরে বান্দরবানের আলীকদমে যেতে হবে। বিকল্প হিসেবে ঢাকা থেকে চকরিয়া গিয়ে সেখান থেকে স্থানীয় পরিবহনে আলীকদম যাওয়া যায়।
আলীকদম বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশায় পানবাজার এবং সেখান থেকে মোটরসাইকেল বা জিপগাড়িতে করে ২১ কিলো এলাকায় যেতে হয়। এরপর শুরু হয় পায়ে হাঁটার পথ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় স্থানীয় গাইড সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কির্সতং ভ্রমণের আগে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা, নিরাপত্তাবিধি ও ওই এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়াও জরুরি।
প্রকৃতির কাছে ফেরার সুযোগ
কির্সতংয়ের আকর্ষণ শুধু পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো নয়; বরং সেখানে পৌঁছানোর পুরো পথটিই একটি অভিজ্ঞতা। ঘন অরণ্যের নীরবতা, মেঘ-কুয়াশার আবরণ, পাহাড়ি জনপদের জীবন আর দুর্গম ট্রেকিং—সবকিছু মিলিয়ে কির্সতং হয়ে উঠেছে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার এক অনন্য সুযোগ।
তবে কির্সতংকে সাধারণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুর্গম পথ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এখানে ভ্রমণে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হয়। একই সঙ্গে পাহাড়ের পরিবেশ, বনজ সম্পদ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রেখে দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করাই হতে পারে কির্সতংয়ের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখার অন্যতম উপায়।
কেকে/ এমএস