সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● ছাত্র আন্দোলনের মুখে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ      ● নানা বিতর্কে আস্থা হারাচ্ছে বিএনপি      ● তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সংবিধানের দুই অনুচ্ছেদে গণভোট চায় বিএনপি      ● হাম ও ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেল ১৫ জনের      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ২১৫৮       ● হামের উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩৪১      ● জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে : মন্ত্রী টুকু      
দেশজুড়ে
কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক উড়ানের প্রস্তুতি
মো. নেজামউদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২২ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার এবার সরাসরি যুক্ত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক আকাশপথের সঙ্গে। বঙ্গোপসাগরের জলরাশি ভরাট করে সম্প্রসারিত দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে এবং বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নির্মিত আধুনিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ভবন—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রস্তুত কক্সবাজার বিমানবন্দর।

চোখজুড়ানো নীল জলরাশির পাশে রানওয়ের শেষপ্রান্ত যেন মিশে গেছে সাগরের সঙ্গে। সেই রানওয়েতেই আগামী অক্টোবর থেকে বড় আকারের বিদেশি উড়োজাহাজ ওঠানামার পরিকল্পনা রয়েছে।

সমুদ্রের ওপর ১ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে

কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে। এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ১ হাজার ৭০০ ফুট। বর্তমানে এটি ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের চেয়েও দীর্ঘ।

রানওয়ে সম্প্রসারণের ফলে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর-এর মতো বড় আকারের ওয়াইডবডি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নত করা হয়েছে রানওয়ে ও এয়ারফিল্ডের আলোকব্যবস্থা। সমুদ্রের ওপর সম্প্রসারিত অংশেও প্রয়োজনীয় লাইটিং অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে।

রাতের বেলা এবং বৈরী আবহাওয়ায় নিরাপদ উড়োজাহাজ ওঠানামার জন্য রানওয়েটিকে ক্যাটাগরি-২ অপারেশনের উপযোগী করা হয়েছে।

কক্সবাজার বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর এম. মোশাররফ হোসেন বলেন, “বিদ্যমান রানওয়ের ওপর অ্যাসফাল্টের ওভারলে দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রসারিত অংশসহ ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ের নির্মাণকাজও সম্পন্ন হয়েছে। রানওয়ে, লাইটিং ও সংশ্লিষ্ট সব কাজ শেষ হওয়ায় বিমানবন্দরটি এখন উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত।”

৩৬২ কোটি টাকায় আধুনিক টার্মিনাল

রানওয়ের পাশেই প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটারের আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল। এতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উপযোগী বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।


টার্মিনালে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার, ১০টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক, আধুনিক লাগেজ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ও এক্স-রে স্ক্যানার। যাত্রীদের চলাচলের জন্য স্থাপন করা হয়েছে চারটি এসকেলেটর ও ছয়টি লিফট। আন্তর্জাতিক বহির্গমন লাউঞ্জে একসঙ্গে ৪৫০ জন যাত্রী বসতে পারবেন।

বেবিচকের প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা কক্সবাজারের নতুন টার্মিনালেও যুক্ত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কক্সবাজার যাত্রী টার্মিনাল প্রকল্পের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মো. নুরনবী বলেন, “হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের জন্য টার্মিনালে চারটি এবং কেবিন ব্যাগেজের জন্য তিনটি স্ক্যানার রয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এলাকায় হোল্ড ব্যাগেজের দ্বিতীয় ধাপের স্ক্যানিং সুবিধাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক মেটাল ডিটেকশন ও ব্যাগেজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ ও ইমিগ্রেশন এলাকাতেও প্রয়োজনীয় স্ক্যানিং সুবিধা রয়েছে।”

যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়ছে প্রায় তিনগুণ

নতুন অবকাঠামো চালু হলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ২০ লাখে উন্নীত হবে।

বেবিচকের সাবস্টেশন ইঞ্জিনিয়ার মো. সোহেল রানা বলেন, বছরে প্রায় ২০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় বিদেশি সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। লাগেজ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, বোর্ডিং ব্রিজ, ব্যাগেজ বেল্টসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির পরীক্ষামূলক পরিচালনা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের কাজও শেষ হয়েছে। এখন টার্মিনালটি যাত্রীসেবা চালুর জন্য প্রস্তুত।

বেবিচক জানিয়েছে, টার্মিনালের বিভিন্ন বিদেশি সরঞ্জামের পরীক্ষামূলক পরিচালনা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণার পরিকল্পনা

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) থেকে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের যাতায়াত নতুন টার্মিনালের মাধ্যমে শুরু হবে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার পর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রধান অতিথির উপস্থিতিতে বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন, নেপাল ও ভুটানসহ কয়েকটি বিদেশি এয়ারলাইনসও কক্সবাজার থেকে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে।

কক্সবাজার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য তারা প্রস্তুত। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় জনবল রয়েছে এবং রানওয়ে ও নতুন টার্মিনাল প্রস্তুত থাকায় আন্তর্জাতিক যাত্রীদের সেবা দিতে বড় কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

পর্যটনের পাশাপাশি বাড়বে বাণিজ্যের সম্ভাবনা

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের আওতায় আনার ফলে শুধু বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হবে না, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের পাশাপাশি কক্সবাজারের অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম হয়ে বিদেশে পাঠানো শুঁটকি, সবজি ও অন্যান্য স্থানীয় পণ্য ভবিষ্যতে কক্সবাজার থেকেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তার মতে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পাশাপাশি ট্রানজিট ও জ্বালানি সরবরাহের সুবিধা চালু করা গেলে সরকারের রাজস্ব আয়ের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। তবে এজন্য দ্রুত কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, কার্গো ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক সুবিধা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।

কক্সবাজার চেম্বারের ব্যবসায়িক নেতাদের ভাষ্য, বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গেলে কক্সবাজারের শুঁটকি, তাজা সবজি ও অন্যান্য স্থানীয় পণ্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধিও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পুরোনো উদ্যোগের নতুন যাত্রা

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করা হলেও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে তা স্থায়ী রূপ পায়নি। এবার বড় পরিসরের অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

রানওয়ে ও টার্মিনালের বড় অংশের কাজ শেষ। অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা এবং পর্যাপ্ত যাত্রী নিশ্চিত করা।

হাজার কোটি টাকার এই অবকাঠামো কক্সবাজারের পর্যটন, আকাশপথের যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


কেকে/সাশ



আরও সংবাদ   বিষয়:  কক্সবাজার বিমানবন্দর   আন্তর্জাতিক ফ্লাইট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close