কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সে জমা হওয়া স্বর্ণালংকার, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব নির্ধারণের কাজ শুরু হয়েছে ছয় বছর পর। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারিতে সংরক্ষিত এসব মূল্যবান সামগ্রী ওজন, শ্রেণিবিন্যাস ও গণনার মাধ্যমে হিসাব করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে জানা যাবে, দানের এসব স্বর্ণ-রুপার পরিমাণ কত এবং বাজারমূল্যই বা কত।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল পৌনে ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় নয়টি মাঝারি আকারের প্লাস্টিকের কন্টেইনার ও ছয়টি সিলগালাকৃত খাম খুলে গণনার কাজ শুরু করা হয়। এসব পাত্রে গত কয়েক বছরে দানবাক্সে পাওয়া স্বর্ণালংকার, রুপা ও বিভিন্ন দেশের মুদ্রা সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জেসমিন আক্তার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, সর্বশেষ ২০২০ সালের ১১ মার্চ দানবাক্সে পাওয়া স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার ওজন ও গণনা করা হয়েছিল। এরপর থেকে ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ বার দানবাক্স খোলা হয়েছে। প্রতিবার পাওয়া স্বর্ণালংকার, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারিতে।
তিনি বলেন, দানবাক্স খোলার পর নগদ টাকা গণনা করা হলেও স্বর্ণালংকার, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা আলাদা কন্টেইনার ও খামে রাখা হয়। পরে সেগুলো সিলগালা করে ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হয়। এবার স্বর্ণের ক্যারেট অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস, ওজন নির্ধারণ এবং রুপার পরিমাণ হিসাব করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, গণনা শেষে স্বর্ণ ও রুপার বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিলামের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করা হবে। অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রা দেশভিত্তিক পৃথক করে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ বিনিময় হার অনুযায়ী নগদায়ন করা হবে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১১ মার্চের সর্বশেষ গণনায় ৪১৫ ভরি এক আনা স্বর্ণ এবং ১৮৪ ভরি রুপা পাওয়া গিয়েছিল। নিলামে এসব স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি করে আয় হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ৯০০ টাকা। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা নগদায়ন করে পাওয়া যায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৫৮ টাকা।
এবারের গণনা কার্যক্রম পরিচালনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে নয় সদস্যের একটি উপকমিটি কাজ করছে। নিরাপত্তায় রয়েছেন জেলা প্রশাসনের তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ১০ জন পুলিশ সদস্য ও ছয়জন আনসার সদস্য। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছয়জন কর্মচারী, মসজিদের কর্মকর্তা, জুয়েলার্স সমিতির ১০ জন স্বর্ণকার এবং রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা গণনা ও হিসাব নির্ধারণে সহযোগিতা করছেন।
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা পড়ে। জেলা প্রশাসক জানান, সর্বশেষ গত ২৭ জুন মসজিদের ১৩টি দানবাক্স খোলা হয়েছিল। সেদিন ৪৩ বস্তা টাকা পাওয়া যায়। বর্তমানে মসজিদের তহবিলে জমা রয়েছে ১৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮১০ টাকা।
মসজিদে সরাসরি অনুদানের পাশাপাশি অনলাইনেও দানের সুযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসকের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইট www.paglamosjid.org-এর মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অনুদান দেওয়া যায়। এ পর্যন্ত অনলাইনে অনুদান এসেছে ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ৯০৬ টাকা।
এদিকে, পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও কাজ চলছে। জেলা প্রশাসক জানান, ১ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৪ টাকা ব্যয়ে তিনটি নামাজের শেড, ওজুখানা ও নারীদের জন্য ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর এ কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের বাইরের অংশে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের নকশা প্রণয়নের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত পাগলা মসজিদ বিপুল দান-অনুদানের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানত পূরণের আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি তাঁরা স্বর্ণালংকার, রুপা ও বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও দান করেন।
ছয় বছর পর এসব মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব নির্ধারণের কাজ শুরু হওয়ায় এবার স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার মোট পরিমাণ এবং আর্থিক মূল্য নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে গণনা ও মূল্য নির্ধারণের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব সামগ্রীর বর্তমান বাজারমূল্য নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
কেকে/সাশ