কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সে জমা পড়েছে ১৭ দেশের বৈদেশিক মুদ্রাসহ ১ হাজার ৪৪ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও ১ হাজার ৮৮ ভরি রৌপ্যালঙ্কার। সব মিলিয়ে এসব অলঙ্কারের পরিমাণ ২ হাজার ১৩২ ভরি।
দীর্ঘ ছয় বছর পর সোমবার (১২ অক্টোবর) এসব মূল্যবান সামগ্রীর ওজন নির্ধারণ, স্বর্ণের ক্যারেট যাচাই এবং বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব সম্পন্ন হয়েছে।
সকাল পৌনে ১০টা থেকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এ কার্যক্রম শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের ওজন নির্ধারণ শেষ হয়। পরে রাত ১০টার দিকে বৈদেশিক মুদ্রা গণনা ও হিসাব নির্ধারণের কাজ শেষ হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে পাগলা মসজিদের দানবাক্সে জমা পড়া স্বর্ণালঙ্কার, রৌপ্যালঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রা জেলা ট্রেজারিতে সংরক্ষিত ছিল। এসব সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও আর্থিক মূল্য নির্ধারণের জন্য সোমবার নয়টি মাঝারি আকারের প্লাস্টিকের কনটেইনার ও ছয়টি সিলগালা করা খাম খোলা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, স্বর্ণকার ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অলঙ্কারের ওজন নির্ধারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা গণনা করা হয়।
১৭ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা
দানবাক্সে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার মধ্যে রয়েছে আমেরিকার ডলার ৮ হাজার ৫৭টি সৌদি রিয়াল ৫৭ হাজার ৪১৪টি, ভারতীয় রুপি ৩৭ হাজার ৮৭৭টি, মালয়েশিয়ান রিংগিত ২৯ হাজার ৬৬২টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম ১৪ হাজার ২৪০টি, মার্কিন ডলার ৮ হাজার ৫৭টি, কাতারি রিয়াল ৭ হাজার ৯৭৩টি, ইউরো ৫ হাজার ২৪৫টি, ব্রিটিশ পাউন্ড ১ হাজার ২২০টি, সিঙ্গাপুর ডলার ১ হাজার ৭১৮টি, ওমানি রিয়াল ৮৮৮টি, কুয়েতি দিনার ৭৬৭টি, বাহরাইনি দিনার ৩৩৩টি, অস্ট্রেলিয়ান ডলার ৫৫৫টি, কানাডিয়ান ডলার ২৫টি, মালদ্বীপের রুফিয়া ৯০০টি এবং চীনা ইউয়ান ৩০৫টি। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি—এমন ২ হাজার ৬৬৭টি ধাতব মুদ্রা পাওয়া গেছে।
বৈদেশিক মুদ্রাগুলোর বাংলাদেশি টাকায় মূল্য এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ বিনিময় হার অনুযায়ী এসব মুদ্রার মূল্য নির্ধারণ করে নগদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিলামে বিক্রি হবে স্বর্ণ-রুপার অলঙ্কার
ওজন নির্ধারণের কাজ শেষ হলেও স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের বাজারমূল্য এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে বাজারমূল্য নির্ধারণ করে নিয়ম অনুযায়ী নিলামের মাধ্যমে এসব অলঙ্কার বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত নয় সদস্যের উপকমিটির তত্ত্বাবধানে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে জেলা প্রশাসনের তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, আনসার, ব্যাংক কর্মকর্তা ও স্বর্ণকারেরা সহযোগিতা করেন। জেলা জুয়েলারি সমিতির ১০ জন সদস্য অলঙ্কারগুলোর ওজন ও পরিমাপ নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলী, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) জেবুন নাহার শাম্মী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জেসমিন আক্তার এবং অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদসহ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
ছয় বছর আগে বিক্রি হয়েছিল ৬০৮ ভরি অলঙ্কার
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১১ মার্চ পাগলা মসজিদের দানবাক্সে জমা পড়া ৪২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও ১৮৮ ভরি রৌপ্যালঙ্কার নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। এসব অলঙ্কার বিক্রি করে পাওয়া যায় ১ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ১১০ টাকা। একই সময়ে দানবাক্সে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে আরও ৭০ লাখ টাকা আয় হয়েছিল।
এরপর দীর্ঘ ছয় বছর দানবাক্সে জমা হওয়া স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নির্ধারণের কার্যক্রম হয়নি। এবার এসব মূল্যবান সামগ্রীর ওজন ও পরিমাণ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে মসজিদে জমা হওয়া সম্পদের নতুন হিসাব সামনে এসেছে।
মসজিদের তহবিলে ১৩১ কোটি টাকার বেশি
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে জমা রয়েছে ১৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮১০ টাকা। মসজিদে সরাসরি দানের পাশাপাশি অনলাইনেও অনুদান দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইট www.paglamosjid.org-এর মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অনুদান দেওয়া যায়। এ পর্যন্ত অনলাইনে ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ৯০৬ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, ১ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৪ টাকা ব্যয়ে তিনটি নামাজের শেড, ওজুখানা ও নারীদের জন্য ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর এ কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া মসজিদে আগত মুসল্লিদের সুবিধার্থে বাইরের অংশে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য নকশা প্রণয়নের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সর্বশেষ দানবাক্সে মিলেছিল প্রায় ১৬ কোটি টাকা
সর্বশেষ চলতি বছরের ২৭ জুন পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা হয়েছিল। সেদিন গণনা শেষে পাওয়া যায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। এরপর থেকে দানবাক্সে জমা হওয়া স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব নির্ধারণের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ বিপুল পরিমাণ দান-অনুদানের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস, মানত ও নানা আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। তাঁরা নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রাও দান করেন।
এসব দান-অনুদানের অর্থ মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবার ছয় বছর পর জমা হওয়া স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব নির্ধারণের ফলে এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য নিরূপণের পথ তৈরি হয়েছে। তবে স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের বাজারমূল্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাংলাদেশি টাকায় মোট মূল্য নির্ধারণের পরই দান হিসেবে জমা পড়া এসব সম্পদের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক চিত্র পাওয়া যাবে।
কেকে/সাশ