শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে নোটিশ, তবু অনুমোদন ছাড়াই চলছিল টুপটুপ রিসোর্ট      ● কক্সবাজারের রিসোর্টে ভয়াবহ আগুন, ৩ শিশুসহ ১০ পর্যটকের মৃত্য      ● ধর্ম যার যার-রাষ্ট্র সবার, নিরাপত্তার অধিকার সবার : প্রধানমন্ত্রী      ● দিল্লিতে মিছিলের পূর্বেই আটক অভিজিৎ, হেফাজতে নেহা বোরা      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১১৮১       ● হাম উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু      ● আবারও গুলি-কুপিয়ে জখম, চাঁদাবাজি-দখলবাজিতে টালমাটাল মোহাম্মদপুর      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
কোন পথে ইয়েমেন সংঘাত?
আবদুস সামাদ আলফগিহ
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৭ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবে হামলা ইয়েমেনের যুদ্ধকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। বিমানবন্দরসহ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলায় অন্তত এক ডজন মানুষ নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। ফলে সংঘাতের বিস্তার সীমিত রাখতে আগে যে ‘লাল রেখা’ বা উত্তেজনা বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা আর বজায় রাখার সুযোগ থাকছে না।

হুথিদের এই পদক্ষেপ একটি বেপরোয়া জুয়া, যা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের স্বার্থেরই পরিপন্থি হতে পারে। তারা জানে, এসব হামলার জবাবে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তা সত্ত্বেও তারা সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। লেখকের মতে, এর পেছনে রয়েছে ইরানের এমন একটি কৌশল, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংঘাতের ভবিষ্যৎ দুটি সম্ভাব্য পথে এগোতে পারে—হুতিদের বিরুদ্ধে বৃহৎ আঞ্চলিক সামরিক অভিযান, অথবা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধ।

হুতিদের হামলার জবাবে সৌদি আরব সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে দেশটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে। এর লক্ষ্য হলো এমন একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গড়ে তোলা, যা হুতিদের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।

রিয়াদ বিশেষভাবে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সমর্থন চাইছে। এসব দেশও চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সৌদি আরব একা নয়, বরং পুরো অঞ্চলই গুরুতর বিপদের মুখে—এমন একটি উপলব্ধি তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

এ কারণে ওমানের মতো ব্যতিক্রম ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো ইয়েমেনে সৌদি আরবকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করতে পারে।

পাকিস্তান ও তুরস্কও এই জোটে যোগ দিতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে তারা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদিত হলে সৌদি আরবকে সহায়তা দিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের পথ খুলে যেতে পারে। ইতোমধ্যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের পরোক্ষ সম্পৃক্ততার পাশাপাশি রসদ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রমও অনেক দূর এগিয়েছে বলে লেখক মনে করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানের প্রতি মার্কিন ভোটারদের অনাগ্রহের কারণে দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।

আঞ্চলিক দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীগুলোর পাল্টা অভিযানে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও ধুবাবের আশপাশের এলাকাসহ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল পুনর্দখলের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের অগ্রগতি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ কমাতে পারে এবং সামরিক ভারসাম্য সরকারের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারে। ইয়েমেনের বিভিন্ন শহর ও প্রদেশে নতুন নতুন রণাঙ্গন খুলতে পারলে হুথিদের বাহিনীকে ছড়িয়ে পড়তে হবে। এতে তাদের জনবল ও সামরিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়বে এবং সরকারি বাহিনীর আরও অগ্রযাত্রার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা পুনর্দখলের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তবে এ পথে প্রধান বাধা হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। সরকারপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এর সঙ্গে বাইরের নেতিবাচক হস্তক্ষেপ যুক্ত হয়ে বিভাজন আরও বাড়াচ্ছে এবং হুথিদের মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং সামরিক অভিযানের কমান্ডব্যবস্থা সুসংহত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তবে সানা পুনর্দখলের মতো বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা ও সুদৃঢ় সংকল্প প্রয়োজন।

সরকারি বাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারলে হুথিরা যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে কিছু ছাড় দিতে রাজি হতে পারে। অতীতেও তারা এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। লেখকের মতে, এর উদ্দেশ্য প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়; বরং পুনরায় সংগঠিত হয়ে ভবিষ্যতে লড়াইয়ে ফেরার জন্য সময় ও সুযোগ আদায় করা। তাই হুথিদের সঙ্গে আলোচনার সময় এই বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।

অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও ইয়েমেন সরকার যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও মতবিরোধ কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়, তাহলে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে হুতিরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের ওপর চাপ বাড়াতে এবং সৌদি আরবের বেসামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যেতে পারে।

এর ফলে সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠবে। বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি বাড়বে এবং কোনো পক্ষের নির্ণায়ক সামরিক বিজয় ছাড়াই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে।

এ ধরনের পরিস্থিতি সৌদি আরবের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দেশটির উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ তখন প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষতি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে হুতিদের কাছে ভূখণ্ড হারানোর অর্থ হবে, হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক সংকটও অব্যাহত থাকা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।

এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে এমন এক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে, যেখানে কোনো পক্ষই প্রকৃত বিজয়ী হবে না, আবার পরাজিতও হবে না। তবে লেখকের মতে, এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে ইরান।

লোহিত সাগর উপকূলে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধ তেহরানকে কৌশলগতভাবে কিছুটা স্বস্তি দেবে। এতে নিজেদের যুদ্ধপ্রচেষ্টার ওপর থেকে চাপ কমানোর সুযোগ পাবে ইরান।

একই সঙ্গে হুথিদের ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে চলমান বিরতিযুক্ত আলোচনায় নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারবে তেহরান। এর ফলে আলোচনায় নিজেদের শর্ত ও দাবি আরও কঠোর করার সাহস পেতে পারে ইরান।

লেখকের মতে, ইয়েমেন সংকটের সমাধানের একমাত্র পথ হলো দেশটির সরকারের নেতৃত্বে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক জোটের সমর্থনে নির্ণায়ক সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া। তবে এমন পদক্ষেপ কার্যকর করতে হলে ইয়েমেন সরকারকে প্রথমে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ দূর করতে হবে এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক সুসংহত করতে হবে। 

ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ঐক্য ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। একদিকে হুথিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সামরিক অভিযান তাদের অবস্থান দুর্বল করে যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। অন্যদিকে, মিত্রদের বিভক্তি ও সমন্বয়হীনতা সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে, যার কৌশলগত সুবিধা পাবে ইরান।

তবে সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য ফলাফল যা-ই হোক, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে। তাই সামরিক সমীকরণের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, মানবিক সংকটের অবসান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না।

লেখক: ওয়াশিংটন সেন্টার ফর ইয়েমেন স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি
আলজাজিরা থেকে অনূদিত

কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  ইয়েমেন সংঘাত  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close