বিদ্যুৎ আধুনিক সভ্যতার চালিকাশক্তি। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষির অগ্রগতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক জীবনযাত্রা কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় এবং চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান জ্বালানী সংকটের অন্যতম বড় কারণ প্রাকৃতিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি। যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হ্ওয়ায় জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে এর প্রভাব পড়েছে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহে।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, একই সাথে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতাও তৈরি করছে অর্থনৈতিক চাপ। এমন বাস্তবতায় খালি পড়ে থাকা বাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনের ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভাবনায় তাই গুরুত্ব পাচ্ছে ‘রুফটপ সোলার’ বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ।
নিজের ছাদই হতে পারে বিদ্যুতের ছোট্ট কেন্দ্র এই ভাবনাকে সামনে রেখে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে নতুন গতি আনতে চায় সরকার। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয় এটি বর্তমানের প্রয়োজন। বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাময় জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
একটি বাড়ির ছাদ সাধারণত দিনের বেশির ভাগ সময়ই অব্যবহৃত থাকে। অথচ সেই ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে ভবনের নিজস্ব চাহিদা মেটাবে; অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। এখানেই পরিকল্পনাটির বিশেষত্ব। একজন বাড়ির মালিক বা কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী থাকবে না প্রয়োজনে বিদ্যুৎ উৎপাদকও হয়ে উঠতে পারবে। বিএনপি সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যেমে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে (১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট)। যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের কথা রয়েছে রুফটপ সোলার থেকে।
‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থায় মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে সরকারি ভবন থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের হাট বাজারের ভবনের ছাদগুলোতেও সৌর বিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে দেশব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্যই এই মহাপরিকল্পনা। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শুধু ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি। স্বয়ং তাঁর গুলশানে তার নিজ বাসভবনের ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন। তার বাসভবনের ছাদে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের ১ হাজার ইউনিট নিজস্ব চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ১ হাজার ২০০ ইউনিট জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয়েছে। আইএমএফ তথ্য মতে দেশের ২৩৯ কারখানার ছাদে ৬৬৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসেবে দেশে বর্তমানে ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট উল্লেখ করা হলেও আইইইএফএ-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী ক্ষুদ্রাকার স্থাপনাগুলো হিসেবে নিলে মোট সক্ষমতা ১,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে।
আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দেশের বিদ্যুৎ খাতকে নানা সংকটের মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎ বা সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বাংলাদেশ একটি সূর্যালোকসমৃদ্ধ দেশ। বছরের অধিকাংশ সময়ই এ দেশে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ শুধু পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমানোর একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গত কয়েক দশকে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। বিগত সরকারের নেওয়া নীতি, প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি এবং জবাবদিহিতার অভাব এই খাতকে দুর্নীতির একটি বড় উৎসে পরিণত করেছে। সাম্প্রতিক জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত দেড় দশকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন মাত্র ৪ গুণ বাড়লেও এর পেছনে সরকারি ব্যয় ও খরচ বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ।
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকারিতা এবং সঞ্চালনব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গ্যাসের সংকট, আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের আর্থিক ব্যয় বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। এর প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, কৃষি উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, কৃষি কার্যক্রম বিঘ্নিত হয় এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, হাসপাতালের সেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং বিদ্যুতের উৎসের বৈচিত্র্য, সাশ্রয়ী উৎপাদন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সূর্যের আলো ব্যবহার করে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এ পদ্ধতিতে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন হয় না, উৎপাদনকালে বায়ুদূষণও তুলনামূলকভাবে কম হয়। ফলে সৌরবিদ্যুৎ একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক, অন্যদিকে তেমনি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি করে।
পাহাড়ি এলাকা,দ্বীপাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ দুর্বল, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করতে পারে। কৃষি খামার, সেচপাম্প, মৎস্য খামার, হাঁস-মুরগির খামার এবং ক্ষুদ্র শিল্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও গতিশীল হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। কৃষির আধুনিকায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সেচব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেলচালিত সেচপাম্পের পরিবর্তে সৌরচালিত সেচপাম্প ব্যবহার করা গেলে কৃষকদের জ্বালানি ব্যয় কমতে পারে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস পাবে। অন্যদিকে শিল্প খাত দেশের কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা গেলে দিনের বেলায় নিজস্ব বিদ্যুতের একটি অংশ উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অন্যান্য বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পে এ উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা মিলবে।
বাংলাদেশে কৃষিকাজে বর্তমানে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। আইইইএফএ-এর মতে, যদি মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ডিজেল পাম্পকে সৌরবিদ্যুৎ চালিত সিস্টেমে রূপান্তর করা যায়, তবে বছরে ডিজেল আমদানিতে ব্যয় হওয়া প্রায় ২৪৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
সৌরবিদ্যুতের সাথে এর যন্ত্রপাতি স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত সৌরবিদ্যুৎ নীতি গ্রহণ করতে হবে। সৌর প্যানেল স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ, স্বল্পসুদের অর্থায়ন, উপযুক্ত প্রণোদনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। একই সাথে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকদের জন্য সহজ, স্বচ্ছ এবং কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার সাথে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সংযোগ সহজ করতে হবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্য ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিম্নমানের প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি ব্যবহারের ফলে বিনিয়োগের সুফল নষ্ট হতে পারে। তাই মানসম্মত প্রযুক্তি, দক্ষ কারিগর এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবহৃত সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে পড়ে। এ কারণে দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির গবেষণা, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে এ খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় বিষয়ে পাঠদান এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা দরকার। গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সৌরবিদ্যুতের উপকারিতা, স্থাপনের পদ্ধতি, বিনিয়োগের হিসাব এবং রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জনগণকে বাস্তবভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করা জরুরি।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা অর্থনীতিতে। একটি পরিবার যদি নিজের প্রয়োজনের বড় অংশের বিদ্যুৎ নিজেই উৎপাদন করতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একইভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ ছাদ থেকেই পূরণ করতে পারবে। আর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করার সুযোগ থাকলে ছাদ হয়ে উঠতে পারে একটি ক্ষুদ্র বিনিয়োগ প্রকল্প।
জাতীয় পর্যায়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, কৃষিতে সৌরচালিত সেচব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্রামীণ এলাকায় ক্ষুদ্র সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থার উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি সৌরবিদ্যুৎ একাই বাংলাদেশের সব বিদ্যুৎ সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারবে না। তবে পরিকল্পিতভাবে এর সম্প্রসারণ করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বৈচিত্র্যময় হবে, জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত হবে।
সূর্যের আলো বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। এ জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বিনিয়োগনীতি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনগণের অংশগ্রহণ। বিদ্যুৎ সংকট একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্য অর্জনে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় মাধ্যম।
বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধয় নয়; বরং কোন উৎস থেকে কত কম ব্যয়ে,কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে এবং কতটা পরিবেশসম্মত উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা। সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ । এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে এ কারণেই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আজকের পরিকল্পিত বিনিয়োগই আগামী দিনের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ একটি অধিকতর স্বনির্ভর, জ্বালানি-নিরাপদ ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রীর রুফটপ সোলার উদ্যোগ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের কর্মসূচি নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি নির্ভরতা কমানো, পরিবেশ সুরক্ষা এবং নাগরিককে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশীদার করার একটি বৃহত্তর ভাবনা হিসেবে সামনে আসছে। আজ যে ছাদে মানুষ কাপড় শুকায়, বিকেলে বসে আড্ডা দেয় কিংবা বছরের পর বছর খালি পড়ে থাকে সেই ছাদই আগামী দিনে হয়ে উঠতে পারে একটি ছোট্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র।
কেকে/এমএ