কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় প্রয়াত বিএনপি নেতা ডা. সাইফুল ইসলামের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে জামায়াতের পক্ষ থেকে দেওয়া সেলাই মেশিন ফেরত দিয়েছেন তার স্ত্রী ঝুমা আক্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেলাই মেশিন দেওয়ার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর এ ঘটনা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের উত্তর জামষাইট গ্রামে প্রয়াত সাইফুল ইসলামের বাড়ি থেকে সেলাই মেশিনটি নিয়ে যান জামায়াতের স্থানীয় নেতারা। এ সময় বনগ্রাম ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেনের পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় ঝুমা আক্তার জানান, তিনি জানতেন, তার স্বামীর এক বন্ধু সেলাই মেশিনটি দিয়েছেন। তবে এটি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তা তিনি জানতেন না। পরে বিষয়টি জানতে পারেন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর মেশিনটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ভিডিও বার্তায় ঝুমা আক্তার বলেন, ‘আমি জানতাম, আমার স্বামীর বন্ধু আমাকে সেলাই মেশিনটি দিয়েছেন। কিন্তু এটি যে জামায়াতের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তা জানতাম না। পরে জানতে পেরে মেশিনটি ফেরত দিচ্ছি। আমি বিএনপি পরিবারের সদস্য।’
সেলাই মেশিন ফেরত নেওয়ার বিষয়ে ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি মাওলানা মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘ইউনিয়ন জামায়াতের পক্ষ থেকে মানবিক বিবেচনায় পরিবারটিকে সেলাই মেশিনটি দেওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিবারটি মনে করে, এতে তাদের পারিবারিক মানসম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ কারণে তারা মেশিনটি ফেরত নেওয়ার অনুরোধ জানায়।’
তিনি বলেন, ‘সাইফুল সাহেবের স্ত্রী আমাকে ফোন করে মেশিনটি নিয়ে যেতে বলেন। শনিবার সকালে আমরা সেটি নিয়ে আসি।’
স্থানীয়রা জানান, প্রয়াত বিএনপি নেতা ডা. সাইফুল ইসলামের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ঝুমা আক্তার তিন মেয়েকে নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন। পরিবারের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জামায়াতের স্থানীয় নেতারা তাকে একটি সেলাই মেশিন উপহার দেন। তবে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়। পরে ঝুমা আক্তার সেলাই মেশিনটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কটিয়াদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রয়াত বিএনপি নেতার পরিবারটি অসহায় হওয়ায় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেলাই মেশিনটি উপহার দেওয়া হয়েছিল। এর আগেও পরিবারটিকে গোপনে আর্থিক সহায়তা করা হয়েছে, যা প্রচার করা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যেই এ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে এ কারণে পরিবারটি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের চাপের মুখে পড়ুক, তা তারা চান না।’
অন্যদিকে, বনগ্রাম ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ডা. সাইফুল ইসলাম কটিয়াদী উপজেলার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তিনি পল্লিচিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী ঝুমা আক্তার তিন মেয়েকে নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, ‘মাওলানা ইদ্রিস আলী ব্যক্তিগত উদ্যোগে বন্ধুর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সেলাই মেশিনটি দিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। এ কারণে পরিবারটি সেলাই মেশিনটি ফেরত দিয়েছে।’
আনোয়ার হোসেন জানান, সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিনের উদ্যোগে পরিবারটির জন্য শৌচাগার নির্মাণ, নলকূপ স্থাপন ও বাড়ি মেরামতের কাজ চলছে। পাশাপাশি ঝুমা আক্তারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলী বলেন, ‘সেলাই মেশিন ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। জামায়াত দলমত ও ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ, হিন্দু কিংবা মুসলমান—এমন কোনো বিভাজন আমাদের কাছে নেই। যাদের প্রয়োজন, আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। এর অংশ হিসেবে কটিয়াদী জামায়াত হয়তো সেলাই মেশিনটি দিয়েছিল। এখন কেউ চাপ প্রয়োগ করে সেটি ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে থাকলে, সেটি তাদের বিষয়।’
তবে কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সেলাই মেশিন ফেরত দেওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারীর স্বামীর এক বন্ধু ব্যক্তিগতভাবে তাকে সেলাই মেশিন দেওয়ার কথা বলেছিলেন। পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হলে ঝুমা আক্তার ক্ষুব্ধ হয়ে মেশিনটি ফেরত দেন।’
সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘ওই নারী ও তার পরিবার বিএনপির সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা শুরু থেকেই পরিবারটির পাশে রয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন।’
পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য ঝুমা আক্তারের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকালে উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের উত্তর জামষাইট গ্রামে প্রয়াত সাইফুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রী ঝুমা আক্তারের হাতে সেলাই মেশিনটি তুলে দেন জামায়াতের স্থানীয় নেতারা। সাইফুল ইসলাম বনগ্রাম ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে আর্থিক সংকটে পড়েন ঝুমা আক্তার। তার জীবিকার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই সেলাই মেশিন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানান জামায়াত নেতারা।
কেকে/এআই