দুর্গাপূজায় ঢাক বাজবে না, তা কি হয়? ঢাকের শব্দ ছাড়া দুর্গোৎসবের আবহ যেন অপূর্ণ থেকে যায়। অথচ সেই ঢাক, ঢাকি ও ঢাকশিল্পীদের জীবিকা নিয়েই যখন সংকট তৈরি হয়, তখন আমাদের উৎসব আয়োজনের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মন্দিরের আলোকসজ্জা, গানবাজনা কিংবা বর্ণিল আয়োজনের বিরোধিতা করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু উৎসবের জাঁকজমক বাড়াতে গিয়ে যদি সেই উৎসবের ঐতিহ্য বহনকারী মানুষগুলোই উপেক্ষিত হন, তাহলে আমাদের সংস্কৃতিচর্চার সার্থকতা কোথায়?
সাময়িক আনন্দের জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে আলোকসজ্জা ও অন্যান্য আয়োজন করা হচ্ছে, অথচ ঢাক কেনা, ঢাকিদের যথাযথ পারিশ্রমিক দেওয়া কিংবা ঢাকশিল্পীদের কাছ থেকে বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে সেই আগ্রহ কতটা দেখা যাচ্ছে? বরিশালের ঢাকের কারিগরদের অসন্তোষের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তাঁদের তৈরি ঢাক বিক্রি না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি পণ্যের বাজার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কারিগরের শ্রম, পরিবারের ভরণপোষণ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা একটি ঐতিহ্য।
উৎসবের সৌন্দর্য শুধু আলোকসজ্জা, মঞ্চ কিংবা ব্যয়বহুল আয়োজন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সেই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের শ্রম, শিল্প, ঐতিহ্য ও জীবিকার প্রতিও দায়িত্বশীলতা থাকা প্রয়োজন। আমরা যখন উৎসবের জাঁকজমক বাড়াতে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারি, তখন সেই ব্যয়ের একটি অংশ ঢাক কেনা, ঢাকিদের আমন্ত্রণ জানানো এবং তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার জন্য বরাদ্দ করা যাবে না কেন? মন্দিরে একাধিক ঢাক থাকলে, একাধিক ঢাকি বাজালে অসুবিধা কোথায়? গানের সুর ও ঢাকের তাল এক নয়; দুটির নিজস্ব আবেদন ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ঢাক-ঢোল তৈরির কারিগরদের বাস্তবতা এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট করে। মানিকগঞ্জ, দোহার, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, কারিগরেরা দেশীয় আম, জাম, রেইনট্রি, কড়ই ও মেহগনি কাঠ দিয়ে ঢাক-ঢোল তৈরি করছেন। ছাউনির কাজে ব্যবহার করছেন ছাগলের চামড়া, আর বেড়ি তৈরিতে ব্যবহার করছেন মহিষের চামড়া। বাড়ির উঠানেই চলছে কাঠ কাটা, খোল তৈরি, রং করা ও চামড়া লাগানোর কাজ। কাঠের খটখট শব্দে মুখর হয়ে ওঠে গ্রাম। পরিবারের নারী ও শিশুরাও অনেক ক্ষেত্রে এই কাজে সহযোগিতা করেন। অর্থাৎ, বাদ্যযন্ত্র তৈরি কেবল একজন কারিগরের পেশা নয়; এটি বহু পরিবারের শ্রম, আয় ও জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু এই শ্রমের বিপরীতে তারা কতটা আর্থিক নিরাপত্তা পাচ্ছেন? চামড়ার দাম স্বাভাবিক থাকলেও মজুরসংকট, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সমস্যা এবং পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির কারণে কারিগরদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এর পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য ও পেশাটির প্রতি অবমূল্যায়ন অনেককে এই কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এই পেশায় যুক্ত করতে অনীহা প্রকাশ করছেন অনেকে। ফলে সংকটটি শুধু বর্তমান কারিগরদের আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ভবিষ্যৎ।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী এলাকার কারিগর রঞ্জন দাস অভিজ্ঞতা এই সংকটের একটি দিক তুলে ধরে। তঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ বছর আগে আকারভেদে একটি ঢোল পাঁচ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। বর্তমানে তা অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। গানবাজনা, যাত্রানুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাওয়ায় ঢোলের চাহিদাও দিন দিন কমছে বলে জানান তিনি। এতে সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তিনি।
চিত্তরঞ্জন দাসের অভিজ্ঞতা কেবল একজন কারিগরের ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রশিল্পের বাজার ও জীবিকার অনিশ্চয়তার দিকটিও তুলে ধরে। একটি ঢোল তৈরিতে কাঠ, চামড়া, শ্রম ও সময় লাগে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও যদি বিক্রির দাম কমে যায়, তাহলে কারিগরের আয় সংকুচিত হওয়াই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অনিয়মিত চাহিদা। দুর্গাপূজার মতো উৎসবকে কেন্দ্র করে কিছুটা বিক্রি বাড়লেও তা সারা বছরের জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। উৎসবের মৌসুম শেষে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়তে হয় তাদের।
এখানে ঢাক ও ঢোলের পার্থক্যটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। দুটিই ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র হলেও নির্মাণপ্রক্রিয়া, ব্যবহার ও বাজারের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। তবে উভয় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের জীবিকা রক্ষা, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার প্রশ্নটি একই সূত্রে গাঁথা। দুর্গাপূজার আয়োজকেরা ঢাকিদের নিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় কারিগরদের কাছ থেকে ঢাক ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বাদ্যযন্ত্র কিনলে সেই অর্থ সরাসরি উৎপাদকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ সংকট মোকাবিলায় পূজা উদযাপন কমিটি, মন্দির পরিচালনা কর্তৃপক্ষ, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। স্থানীয় ঢাকশিল্পীদের কাছ থেকে বাদ্যযন্ত্র কেনা, ঢাকিদের আগাম বুকিং দেওয়া, ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা এবং তাদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করার মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরদের তালিকা তৈরি, তাঁদের পণ্য বিপণনে সহায়তা, সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের বাজার সম্প্রসারণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
শুধু দুর্গাপূজার কয়েকটি দিনের চাহিদার ওপর নির্ভর করে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বছরব্যাপী বাজার সৃষ্টি করতে হবে। লোকসংগীত, যাত্রাপালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অন্যান্য সামাজিক আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কারিগরদের দক্ষতা, উৎপাদনব্যবস্থা ও বিপণন সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা প্রয়োজন। তাদের পেশার প্রতি সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি, যাতে নতুন প্রজন্ম এই কাজকে অবহেলার নয়, বরং দক্ষতা ও ঐতিহ্যনির্ভর একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখতে পারে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু ঐতিহ্যের প্রদর্শন চাই, নাকি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়েও রাখতে চাই? মন্দিরের আলোকসজ্জায় লাখ লাখ বাতি জ্বলবে, অথচ ঢাকশিল্পীর ঘরে অভাবের অন্ধকার থাকবে—এমন বৈপরীত্য কাম্য হতে পারে না। উৎসবের বাজেট নির্ধারণের সময় তাই দৃশ্যমান জাঁকজমকের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের আর্থসামাজিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকিদের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ। তাদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে এবং তাদের শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। একজন ঢাকির জীবিকা রক্ষা করা মানে শুধু একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো নয়, একই সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করা। একজন ঢাকশিল্পীর তৈরি বাদ্যযন্ত্রের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা মানে তাঁর শ্রম ও দক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া।
দুর্গাপূজার আয়োজন আলোকোজ্জ্বল হোক, আনন্দে মুখরিত হোক চারপাশ। কিন্তু সেই আনন্দ যেন আমাদের শিকড়কে আড়াল না করে। ঢাকের শব্দ শুধু উৎসবের অনুষঙ্গ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের শ্রম, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। সেই পরিচয়কে টিকিয়ে রাখতে হলে ঐতিহ্য বহনকারী মানুষগুলোর জীবন ও জীবিকার প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হবে।
উৎসবের সার্থকতা শুধু কত টাকা খরচ হলো, কত আলো জ্বলল কিংবা কত বড় আয়োজন হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। উৎসবের সার্থকতা নির্ভর করে সেই আয়োজন কতটা মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলল, তার ওপরও। তাই মন্দির আলোকিত করার পাশাপাশি ঢাকিদের ঘরেও স্বচ্ছলতার আলো পৌঁছে দিতে হবে। ঢাক বাঁচাতে হলে ঢাকিকে বাঁচাতে হবে, ঢাকশিল্প বাঁচাতে হলে শিল্পীর জীবিকাকে সুরক্ষিত করতে হবে। কারণ ঐতিহ্য শুধু উদ্যাপন করলেই বাঁচে না, ঐতিহ্য বহনকারী মানুষগুলোর জীবিকা ও মর্যাদা নিশ্চিত করলেই তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকে।
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী
কেকে/এআই