সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তি অস্ত্র ও জনবলে সীমাবদ্ধ নয়; শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থাই একটি বাহিনীর মূল ভিত্তি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে সাভার সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাতটি ইউনিটকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংবিধান, আইন, সামরিক বিধিবিধান ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নৈতিকতা, পেশাগত দক্ষতা এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
মহান মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাসদস্যরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সেই আত্মত্যাগের চেতনা ধারণ করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের ধরন ও কৌশল দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত স্থল, সমুদ্র ও আকাশভিত্তিক প্রতিরক্ষার পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার জাতীয় নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি সময়োপযোগী করে তোলার কাজ চলছে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরিতে প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বও বাড়াতে হবে।
তিনি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। জাতীয় প্রয়োজনে তিন বাহিনী যেন সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। বিদেশের শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের সামরিক সদস্যরা দায়িত্ব পালন করে দেশের সুনাম বজায় রাখছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেনাসদস্যদের কল্যাণ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় পে স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০-১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে ৯ পদাতিক ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে সাতটি ইউনিটকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা প্রদান করা হয়। ইউনিটগুলো হলো—৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট।
প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতকাপ্রাপ্ত ইউনিটগুলোর সদস্যদের অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় পতাকা কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতীক নয়; এটি সংশ্লিষ্ট ইউনিটের ঐতিহ্য, বীরত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের প্রতিনিধিত্ব করে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের আস্থা, স্বীকৃতি ও সম্মান প্রকাশ পায়।’
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধান, সংসদ সদস্য, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সেনাসদস্য এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কেকে/এআই