ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে দিল্লির রাজপথে যে রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছিল, তা কেবলমাত্র বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই আন্দোলন এখন ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার ব্যাপক নাগরিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর), প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়া, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ সব মিলিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। রাহুল গান্ধি, প্রিয়াঙ্কা গান্ধি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিরোধী নেতানেত্রীদের ভূমিকা এবং জেন-জিদের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তরুণদের অংশগ্রহণ। আন্দোলনের সূত্রপাত ও বিস্তারে ককরোচ জনতা পার্টির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পরিচয় থেকে শুরু হওয়া এই গোষ্ঠীর আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ এবং উদ্দীপনা সকলের নজর কেড়েছে। মূলত তাদের উদ্যোগেই সংঘঠিত দিল্লির এই প্রতিবাদ আন্দোলন বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দিল্লির সীমারেখা ছাড়িয়ে এই আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের প্রতিটি প্রান্তে। যেই মোদি সরকার ভারত উপমহাদেশে বিভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বৈরশাসকদের রক্ষায় শক্তি প্রয়োগের নানাবিধ ফর্মুলার পরামর্শ ও উপকরণ দিয়েছে। সেই ভারতে তরুণ প্রজন্মের সিজেপি বা ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের মুখে দেড় দশকের বিজেপি সরকারের ভিত্তি টালমাটাল পরিস্থিতিতে পতিত হয়েছে।
দিল্লিতে বিরোধীদলীয় সাংসদ ও বিক্ষোভকারীদের আটক, মিছিলে বাধা এবং পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাত এই আন্দোলনকে আরও জটিল করেছে। ভারতের তরুণ প্রজন্মের সাম্প্রতিক আন্দোলন কেবল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব কিংবা নির্বাচনী অনিয়মের প্রতিবাদ নয়; এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক প্রজন্মের গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। চলমান আন্দোলনের ফলে ভারতের রাজনীতিতে ২০২৬ সাল এক তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যে তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর, আত্মকেন্দ্রিক কিংবা রাজনীতিবিমুখ বলে চিহ্নিত করা হতো, তাদেরই একটি অংশ এখন রাজপথে নেমে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করছে।
বিশেষত ২০২৬ সালের জুন-জুলাইয়ে শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন এবং অক্টোবর মাসে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ ভারতের গণতন্ত্রের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাজির করেছে: যে রাষ্ট্র তার তরুণদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ বলে অভিহিত করে, সেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তরুণদের আস্থা কতটা অটুট? আন্দোলনটিকে কেবল সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে দেখলে চলবে না বরং এর অন্তর্নিহিত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। একই সঙ্গে বুঝতে হবে, রাজপথে মানুষের উপস্থিতি গণতন্ত্রের প্রাণশক্তির পরিচয় হলেও, সেই উপস্থিতি নিজে থেকেই গণতান্ত্রিক সাফল্য নিশ্চিত করে না।
২০২৬ সালের জুনে মেডিকেল শিক্ষায় ভর্তির জাতীয় যোগ্যতা নির্ধারণী পরীক্ষা এনইইটি এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, পরীক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর পরিশ্রম, পরিবারের সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফল কিংবা ভর্তি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারালে শুধু একটি পরীক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় যোগ্যতা, মেধা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা যে সামাজিক ব্যবস্থার, তার ভিত্তিও। জুলাইয়ে আন্দোলন দিল্লির যন্তর মন্তরে বিস্তৃত হয়। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভের সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে।
আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলনকারীরা তাদের প্রধান দাবিগুলো পূরণ হয়েছে বলে জানিয়ে বিক্ষোভ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। তবে আন্দোলন থেমে যাওয়া আর সংকটের সমাধান হওয়া এক বিষয় নয়। অক্টোবর মাসে সেই ক্ষোভ আবার নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পায়। এবার আন্দোলনের কেন্দ্রে উঠে আসে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান ভোটার তালিকা প্রক্রিয়ায় গত বছর থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম থেকে ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ এই দুইয়ের মধ্যে একটি মৌলিক যোগসূত্র রয়েছে।
প্রথম ক্ষেত্রে তরুণেরা বলছে, তাদের পরিশ্রম ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রশ্ন করছেন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের এবং অন্য নাগরিকদের অংশগ্রহণের অধিকার সুরক্ষিত কি না। উভয় ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের ওপর চলমান নির্মম দমন পীড়ন বন্ধে ককরোচ-আরশোলা জনতার সাথে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিরাও যখন মাঠে নেমেছে। আন্দোলন ঠেকাতে গণগ্রেফতার, ইন্টারনেট বন্ধ, মেট্রো বন্ধের মতো পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, মোদি সরকারের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। কোনো আন্দোলনকে বুঝতে হলে তার স্লোগানের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের জীবনের বাস্তবতাও বুঝতে হয়। ভারতের জেন-জি আন্দোলনের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে কর্মসংস্থানের সংকট।
ভারতের সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের বেকারত্বের হার বেড়ে ১৬.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের এপ্রিলে হারটি ছিল ১৩.৮ শতাংশ। একই সময়ে তরুণদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২.৭ শতাংশ থেকে কমে ৪০.৩ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ বেকারত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সন্ধানে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হারও কমেছে। এই পরিসংখ্যানের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। ভারতের মতো বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশে জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড তখনই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যখন কর্মক্ষম মানুষ পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন কাজ পান।
বিপরীতে, শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ যদি চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে না পারেন, তবে জনমিতিক সুবিধাই সামাজিক হতাশা ও রাজনৈতিক অসন্তোষের উৎস হয়ে উঠতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য লক্ষণীয়। একদিকে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছে; অন্যদিকে সেই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সুফল তরুণদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সুতরাং, তরুণদের ক্ষোভকে কেবল বিরোধী রাজনীতির প্রভাব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতাকে খাটো করে দেখা হবে। ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় যে ‘ভ্রাতৃত্ববোধ’-এর কথা বলা হয়েছিল, তা আজ চরম হুমকির মুখে। চলমান আন্দোলনে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলছে, মোদি সরকারের একনায়কসুলভ শাসনের দিন শেষ হয়ে আসছে।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
কেকে/এআই